সুনেত্রা মন্ডল : আমি সেই দেশের বাসিন্দা, যেখানে খেলা না দেখলেও দূর থেকে ভেসে আসা দর্শকদের হর্ষধ্বনি বলে দেয় খেলার মোড় কোন দিকে ঘুরছে। ২০১০ সাল থেকে মোটামুটি ফুটবলের খোঁজখবর রাখি। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে আমি এমন এক শহরে ছিলাম, যা আয়তনে ঢাকার চেয়েও অন্তত ১০০ বর্গকিলোমিটার বড়। ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই শহর আধুনিকতার দিক থেকেও কোনো অংশে পিছিয়ে নয়।
সেখানে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন যেন শহরটির জীবনে কোনো প্রভাবই ফেলেনি। খুব বেশি জায়গা না ঘুরলেও হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শপিং মল কিংবা পর্যটনকেন্দ্র কোথাও বিশ্বকাপের উন্মাদনার সামান্য ছাপও চোখে পড়েনি।
আমার থাকার কক্ষের টেলিভিশনটি নষ্ট ছিল। কেয়ারটেকারকে সেটি ঠিক করার কথা বলেছিলাম। টেলিভিশন মেকানিকের সঙ্গে সময়ের সমন্বয় না হওয়ায় কয়েক দিন চেষ্টা করেও সেটি আর ঠিক করা গেল না। একদিন কৌতূহলবশত কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনারা খেলা দেখেন না?” তিনি হেসে বললেন, “দেখি, যেদিন ভারতের খেলা থাকে।” আমি বিস্মিত হলাম। এত বড় একটি আয়োজন, অথচ তার প্রতি তেমন আগ্রহ নেই! পরে বুঝলাম, ফুটবল তো আর তাদের দেশের প্রধান খেলা নয়। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন জাগল, ক্রিকেটের বিশ্বকাপ চলাকালেও কি তারা এতটাই নির্লিপ্ত থাকে?
এবার ফিরে আসি নিজের দেশে। দেশে থাকতেই খবর পেয়েছিলাম, একজন ব্যক্তি নিজের জমি বিক্রি করে প্রিয় দলের বিশাল পতাকা তৈরি করেছেন। সেটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। ফুটবলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের সমর্থকদের উন্মাদনাও আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। প্রায়ই দেখা যায়, সমর্থন কখনো কখনো উৎসাহের সীমা ছাড়িয়ে অতি-উৎসাহে রূপ নেয়।
অথচ আমার দেশও তো ক্রিকেট খেলে। কিন্তু দেশের দলকে ঘিরে এতটা আবেগ ও উন্মাদনা খুব কমই চোখে পড়ে। আমি খেলার বিশ্লেষক নই, তবে এটুকু বুঝি আমরা হয়তো অনেক সময় নিজেদের বাদ দিয়ে অন্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিই।
ভালো কিছু সবারই ভালো লাগে। পৃথিবীর সেরাদের প্রতি আকর্ষণ থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে নিজের সামর্থ্য, নিজের পরিচয়, নিজের দলকে কি আমরা সমর্থন করব না? তা সে যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন।
আমি সেইসব মানুষের দলে, যারা নিজেদের চারপাশের ক্ষুদ্রতম বিষয়ের প্রতিও আগ্রহী। গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে আমি অবশ্যই পৃথিবীর সবকিছু থেকে শেখার চেষ্টা করব, কিন্তু নিজের শেকড় ভুলে নয়। আমি আমার তৃণকে ভালোবাসি; অন্যের মহীরুহকে নয়।
সম্ভবত এ কারণেই কবি লিখেছিলেন—
“পাকা হোক তবু ভাই পরেরও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।”
লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।





















