নাজিয়া তাবাসসুম : বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) হিসেবে এই তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা। অর্থনীতিবিদদের মতে, জনমিতিক লভ্যাংশের এই সময়টি সীমিত, এ সময়ে তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করাগেলে ভবিষ্যতে এই সম্ভাবনা হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, শিক্ষা ও কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য, দুর্নীতি এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে অসংখ্য তরুণ আজ হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হলেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি এবং উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বলছে, বিশ্বে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন তরুণ বেকার এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন (NEET)। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর নতুন কর্মী যুক্ত হলেও সেই অনুপাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন অথবা নিজেদের যোগ্যতার চেয়ে কম দক্ষতার কাজে কম বেতনে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। কর্মসংস্থানের এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি আত্মমর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার প্রতীক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের সংকট তরুণদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর স্পেনে যুব বেকারত্ব ৫৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছালে Indignados Movement-এর জন্ম হয়। গ্রিসে ঋণসংকটের সময় যুব বেকারত্ব প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছে দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফ্রান্সে চাকরির অনিশ্চয়তা ও শ্রম আইন সংস্কারের বিরুদ্ধে হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনে অংশ নেন। ইতালিতে শিক্ষিত তরুণদের বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতাকে Brain Drain হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে Sampo Generation শব্দটি জনপ্রিয় হয়েছে, যা এমন এক প্রজন্মকে বোঝায় যারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিয়ে, পরিবার ও সন্তান নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও পিছিয়ে দিচ্ছে। চীনে Tang Ping (Lie Flat) সংস্কৃতি তরুণদের হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে সংকটের সমাধানের উদাহরণও রয়েছে। জার্মানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাকে যুক্ত করে Dual Vocational Training ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার ফলে ইউরোপে তাদের যুব বেকারত্ব তুলনামূলক কম। সিঙ্গাপুর SkillsFuture কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করছে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি গ্রহণ করলে কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরি মোট কর্মসংস্থানের একটি ছোট অংশ হলেও অধিকাংশ তরুণ এখনো সরকারি চাকরিকেই নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে মনে করেন। ফলে অল্পসংখ্যক পদের বিপরীতে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, অভিজ্ঞতার শর্ত এবং দক্ষতার ঘাটতি নতুন স্নাতকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, ফল প্রকাশে বিলম্ব, আদালতে মামলা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তরুণদের আস্থাকে আরও দুর্বল করে। অনেক চাকরিপ্রার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিতে নিতে বয়সসীমা অতিক্রম করেন। এই দীর্ঘ বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা থেকেই ক্ষোভের জন্ম হয় এবং সেই ক্ষোভ একসময় রাজপথে প্রতিবাদে রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা কোটা সংস্কার, নিরাপদ সড়ক, শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়োগে স্বচ্ছতা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বারবার রাজপথে নেমেছেন। এসব আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, তরুণদের দাবি শুধু একটি চাকরি নয়; তারা ন্যায্যতা, জবাবদিহি, সমান সুযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকারও চান। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদ নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তাই তরুণদের আন্দোলনকে শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এর পেছনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিল্পায়ন বৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক কারিগরি শিক্ষার প্রসার, স্টার্টআপে অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, নারী ও গ্রামীণ তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী করতে হবে, যাতে সনদের পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতাও অর্জিত হয়।
তরুণদের নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণরাই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। যে রাষ্ট্র তার তরুণদের কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে ক্ষোভ একসময় রাজপথে বিস্ফোরিত হয়। আর যে রাষ্ট্র তরুণদের সম্ভাবনা, মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারে, তারাই উন্নয়নের নতুন ইতিহাস রচনা করে। তাই তরুণদের ক্ষোভকে দমন নয়, বরং তার কারণগুলো চিহ্নিত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক ন্যায়বিচার, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি। কারণ আজকের তরুণদের স্বপ্ন পূরণই আগামী দিনের সমৃদ্ধ, উদ্ভাবনী, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করবে।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।





















