কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের বিপুল পরিমাণ দানের নেপথ্যে কি রয়েছে?

মোঃ শরীফুল ইসলাম : কিশোরগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের খতিব, মাওলানা আশরাফ আলী জুমার নামাজের সময় বক্তব্য রাখেন আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে নরসুন্দা নদীর তীরে টিলা ছিল। তৎকালীন সময়ে নরসুন্দা নদী ছিল খরস্রোতা যা বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে। সেখানে একটি সোয়ারি ঘাট ছিল যেখানে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল ,ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলা থেকে বর্ষাকালে নৌকা নিয়ে এখানে জড়ো হতো এবং বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতেন।

হযরত নগরের জমিদার বাড়ির সম্পত্তি ছিল যেখানে বর্তমানে পাগলা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। শোলাকিয়া ঈদগাহও তাদের সম্পত্তি ছিল। হযরত নগর থেকে মসজিদের আযান শোনা যেত কিন্তু একটি অলৌকিক ব্যাপার হলো, সেখানে কাউকে কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপর দেওয়ান জিল কদর খাঁন ও আয়শা দাদ খাঁন মিলে ঐ টিলার ওপর একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

সাধারণ জনগণ আয়শা দাদ খাঁন ও জিল কদর খাঁন এই দুই মহিলা কে পাগলা বিবি নামে ডাকতেন। বেশ কিছুদিন যাবত পাগলা বিবির মসজিদ নামে সমাজে প্রচলিত ছিল। দীর্ঘ দিন ধরে সমাজে পাগলা বিবি মসজিদ নামটা ছিল। কালের পরিক্রমায় পাগলা বিবি থেকে পাগলা মসজিদ হিসেবে বর্তমানে সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

পাগলা মসজিদে বিপুল পরিমাণ দানের প্রবণতা কি বা এর নেপথ্যে কি রয়েছে? হয়বত নগরের সর্বশেষ জমিদার মান্নান দাদ খাঁন ও সায়রা মিয়ার অভিমত অনুযায়ী, হিন্দু প্রধান এলাকা ছিল। খরস্রোতা নরসুন্দা নদীতে তারা ভোক দিত অর্থাৎ পূজার সময় খাবার দিত। তৎকালীন সময়ে অল্প কিছু মুসলমান ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোক দিত। এখন প্রশ্ন হলো, মুসলিম সম্প্রদায়রা ভোক কেন দিবেন? আর যদি দিতে হয় তাহলে তারা মসজিদ ভিত্তিক দান করতে পারে। তাই তারা নিজেদের টিলার মধ্যে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন।

মুসলমানরা সেখানে দান করতে থাকে। তৎকালীন সময় থেকে দান করার যে একটা প্রবণতা তা আজও বিরাজমান। অনেকের ধারণা পাগলা মসজিদে দান করলে মনের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। অনেকে রোগব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করে থাকে। মুসলিম ধর্মাবলম্বীর পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও পাগলা মসজিদে দান করেন।

অনেক তরুণ-তরুণী প্রিয় মানুষকে সারা জীবনের জন্য পাওয়ার আশায় মসজিদে চিঠি দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী,গত ২৭-শে জুন পাগলা মসজিদের দান বাক্স দীর্ঘ ছয় মাস পর খোলার পর এইবার ১৩ টি সিন্দুক থেকে ৪৩ বস্তা টাকা সহ স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশী মুদ্রাও পাওয়া গেছে। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা।

এছাড়াও অনেকে প্রতিনিয়ত গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগী মানত করেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় ব্যয় করা হয়? সরেজমিনে দেখা যায়, পাগলা মসজিদের দানের টাকা মসজিদের উন্নয়ন, এতিম শিশুদের পড়াশোনার খরচ ও অসহায় রোগীদের জন্য ব্যয় করা হয়।

এটি শুধু একটি মসজিদ নয় বরং, আপামর জনতার অগাধ বিশ্বাসের প্রতীক। ধর্মীয় আবহ এবং দানের বিস্ময়কর ইতিহাস মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *