লাজবন্তীর বসন্ত

শেখ সুলতানা মীম

অকূল পাথার বাহিয়া, দু’আখি মেলিয়া মুগ্ধ হয়ে দেখি তোমায়—
ওগো লাজবন্তী।
তোমারি রূপেতে আলোকশিখা জ্বলে ওঠে, নেই যেন কোনো কমতি।

কোমড় ছাড়িয়ে পড়া ভেজা চুলগুলো খোঁপা করতে করতে লাজবন্তী বলে-
“ডায়েরির মলিন পাতায় ছন্দবদ্ধ লাইনগুলো পড়তে পড়তে এক অজানা শূন্যতা আমাকে ঘিরে ধরে। তবুও শব্দগুলো আজও নতুন, আজও জীবন্ত। যেন কাগজের বুক ফুঁড়ে তারা নিশ্বাস নেয়।”

হঠাৎই কানে ভেসে এলো পরিচিত স্বর—
— তুমি কি ভেবেছিলে, লাজু, এত সহজে কথারা পুরোনো হয়ে যাবে?

চমকে উঠে চারদিকে তাকাল লাজবন্তী।
— আরে! তুমি? এসে পড়েছো?

— না এসে কি উপায় আছে? বছরের এই একটা সময়ই তো আমার জন্য বরাদ্দ। সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি শুধু এই মুহূর্তটার জন্য। সন্ধ্যার আকাশে সূর্যের লাল আভায় তোমার মুখখানি যখন শিমুলের বাগান হয়ে ওঠে— এমন দৃশ্য কি অবহেলা করা যায়, বলো?

লাজবন্তীর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— তুমি এত সুন্দর করে কথা বলো কীভাবে? বিষণ্ন মনও তোমার কথায় ভালো হয়ে যায়।

— তাই নাকি? আমি কি সত্যিই তোমাকে খুশি রাখতে পারি?

— এ কথা আবার জিজ্ঞেস করার? তুমি এলে চারদিকে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। তোমার সঙ্গী কোকিলের কণ্ঠ, ফুলেদের দোল, হাওয়ার মাদকতা— সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন সংগীতময় অঞ্চল হয়ে ওঠে। মনে হয় দু’টো ডানা গজিয়েছে, ইচ্ছে করলেই উড়ে যাবো দিগন্তে।

বসন্ত মৃদু হেসে বলল—
— বাহ্ লাজু, তুমিও কথা বলা শিখে গেছো।

— না গো, আমি শুধু সত্যিই বললাম। তুমি এলে আমার সারা বছরের মনখারাপ ধোঁয়াশার মতো মিলিয়ে যায়।

— তোমার প্রশংসায় আমি ধন্য, লাজু।

লাজবন্তী ধীরে বলল—
— যতই বলি কম হয়ে যাবে। কারণ তুমি তো ঋতুরাজ বসন্ত।

হালকা বাতাসে চারিদিক স্তব্ধ । শিমুলের লাল পাপড়ি ঝরে পড়ে পথ রাঙিয়ে দিল। দূরে কোকিলের ডাক— “কুহু… কুহু…”।
তখন বসন্ত এগিয়ে এসে বলল—
— জানো লাজু, সবাই আমাকে ভালোবাসে, কিন্তু কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে না। শুধু তুমি করো।

— অপেক্ষা না করে উপায় আছে? তুমি না এলে চারদিক এত ফাঁকা লাগে… আকাশটা কেমন ধূসর হয়ে থাকে।

— অথচ আমি বেশিদিন থাকতে পারি না। এটাই আমার নিয়তি।

কথাটা শুনে লাজবন্তীর বুকটা কেঁপে উঠল।
— তবে কি আবার চলে যাবে?

বসন্ত হেসে মাথা নাড়ল।
— যেতে তো হবেই। সময় কাউকে থামতে দেয় না।

লাজবন্তী মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
— তুমি গেলে আমার ডায়েরির পাতাগুলো আবার নিঃশব্দ হয়ে যাবে।

— না, হবে না। আমি রয়ে যাবো তোমার শব্দে, তোমার কবিতায়, তোমার স্মৃতিতে। যখনই তুমি শিমুলের লাল দেখবে, কোকিলের ডাক শুনবে, নতুন পাতার গন্ধ পাবে— ভাববে আমি আছি।

এক মুঠো বাতাস এসে লাজবন্তীর চুল উড়িয়ে দিল। মনে হলো কেউ যেন আলতো করে ছুঁয়ে গেল।

— লাজু, আমি আবার আসবো। প্রতি বছর ঠিক এই সময়ে। শুধু তুমি অপেক্ষা করো।

ধীরে ধীরে আলো ফিকে হয়ে এলো। আকাশের লাল আভা মিলিয়ে গেল সন্ধ্যার নীলচে অন্ধকারে। বসন্তের অবয়বও কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে গেল।

লাজবন্তী ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।
পাতার ভাঁজে ভাঁজে সে লিখল—
“সে আসে বছরে একবার,
তবু তার ছোঁয়ায় আমার জীবন ভরে যায়।
সে শুধু ঋতু নয়—
সে আমার অপেক্ষার আরেক নাম হয়ে থাকবে-
লাজবন্তীর বসন্ত।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *