লজিং মাস্টার চতুর্থ পর্ব

লজিং মাস্টার

ইমাম হোসেন সবুজ

অজস্র পত্র পল্লব তাদের তিনটি হৃদয়ের অবাধ বিচরণ। শ্রাবন জ্বরে কাঁপতে লাগলো। এক বন্ধু তার মাথায় জল ঢালছে। অন্যজন ঔষধ আনতে ছুটছে। কখনো শ্রাবণের জ্ঞান আসে ,কখনো হয় অচেতন। তিন দিনের জ্বরে, নেমে ঘেমে শ্রাবণ প্রচন্ড দুর্বলতা নিয়ে ,কিছুটা সেরে উঠল বটে। সমস্ত দেহে তার ব্যথা। গভীর মমতায় দুটি চোখ মেলে ,দুটি বাহুর বন্ধনে দুই বন্ধুকে জড়িয়ে বলল,
বন্ধু খোদার কাছে হাজারো শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি এই ছোট্ট জীবনে সাগরের যত জল আছে ততটাই দুঃখ দিয়ে আমার চোখ দুটিকে ঝরাক। কিন্তু আমার এ জীবন থেকে যেন, তোদের কভু না ঝরিয়ে দেন। দুই বন্ধু শ্রাবণকে নিয়ে গেল, পাশের একটি চার দোকানে। দোকানদারের কাছ থেকে নিল এক গ্লাস গরম দুধ, শ্রাবণকে খাওয়ালো তারা। ফয়েজ বলল, জানিস শ্রাবণ, আমরা তো তিন দিন কলেজে যাই না। মাহবুবা ম্যাডাম নাকি, অত্যন্ত কমন একটি হ্যান্ড নোট ডলি কে দিয়েছেন। ডলি সবাইকে দিবে বলেছে, কিন্তু ওই চালাক মেয়েটা কাউকে না দিয়ে চুপ করে রয়েছে। এখন কি করি দোস্ত?
শ্রাবণ বলল, এখানে সমস্যা কি? স্বাভাবিকভাবে তার কাছে চাইবি। সে অবশ্যই দিয়ে দিবে।
–দূর ব্যাটা। এমনিতেই তোর সাথে ওর চ্যালেঞ্জ চলছে। তারপর সে একদম ছেলেদের দুচোখের বিষ মনে করে, ওই ৮ ফুটের উর্বশী।
শ্রাবণ ভাবলো এখন পরীক্ষা নিকটে। পড়ালেখার যেকোনো স্বার্থে, কোন প্রকার জড়তাই শ্রাবণের নিকট গণ্য নয়। শ্রাবণ বলল চল ডলিদের বাড়িতে যাব। ফয়েজ তুহিন দুজনেই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। শেষে শ্রাবণকে হাঁটতে দেখে দুজনেই সুবোধ বালকের মতো, প্রিয় বন্ধুর পিছু নিল।
ডলিরা , সনাতন ধর্মাবলম্বী। দেশ গৃহস্থ বাড়ি মনে হচ্ছে। দূর থেকে চোখে পড়ল পাকা ঘর দরজা। বেশ বড় একখানা গোয়াল ঘর উঠনের ঠিক ডান পাশে। হৃষ্টপুষ্ট তরতাজা তিনটি গাভী। হাম্বা হাম্বা রবে, গৃহস্থদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাদের খাবার চাই। ডলি আর মিতালী সম্পর্কে চাচাতো বোন। দুজনের ঘরই পাশাপাশি। ফয়েজ ভাবছে কোনটা ডলিদের কোনটা মিতালীদের। হঠাৎ দরজার কাছে এসে ডলি, তিন বন্ধুর আগমন দেখে, বেশ খানিকটা অবাক হলো। শ্রাবণকে আর চোখে দেখে, কামনার হাসি ছড়িয়ে প্রশ্ন করল ফয়েজকে।
–কি ব্যাপার ফয়েজ ভাই গরিবের বাড়িতে হাতির পা?
ফয়েজ ও দুষ্টুমি তো পাকা।
–না ডলি, তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হলো তাই আসলাম। দরজাতে রেখে কথা বলবে নাকি হাতিদের ঘরে ঢুকতে দিবে।
তুহিন, ফয়েজকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, দোস্ত আমি চিকন হাতি আগে ঢুকবো।
চারজনে হেসে অস্থির। যত্ন করে, তিন রত্নকে বসতে দিয়ে, পারস্পরিক কুশল আদায় করার পর, ডলি রানী ঘোষ রহস্যময় ভঙ্গিমায় শ্রাবণকে উদ্দেশ্য করে বলল, শ্রাবণ সাহেব, আপনারা কি সনাতন ধর্মীদের গৃহ অভ্যন্তরের, কোন প্রকার খাদ্য গ্রহণ করবেন? এক কাজ করি স্রষ্টার দেওয়া গাছের পাকা কলা, আর নারকেলের নাড়ু না হয় পরিবেশন করি। শ্রাবণ লজ্জা পেল। তুহিন বলে উঠলো, নারকেলের নাড়ু, খুব মজার জিনিস। গত বছর পূজো দেখতে গিয়ে, অনেক খেয়েছি। প্লিজ ডলি নিয়ে এসো। তিন বন্ধু খেতে -খেতে । শ্রাবণ ডলির নিকট অত্যন্ত বিনয়ের সাথে হ্যান্ড নোটটি চাইল। ডলির চোখদ্বয়, খুশির ঝিলিক। ছুটে চলল অন্দর নীড়ে। হ্যান্ড নোট শ্রাবণের হস্তে সমর্পণ করে, কিছুটা অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে প্রকাশ করল:- এবার বুঝেছি, আমাকে দেখতে নয়। শ্রাবণ তুমি ছুটে এসেছো হ্যান্ড নোটের প্রত্যাশায়।
–না ডলি! তা হবে কেন?
আরো অনেক হাস্যকৌতুক লেনদেন করে, তিন বন্ধু দলের বাড়ি হতে বিদায় নিয়ে, মেটো রাস্তার পথ ধরে হাঁটলো। হ্যান্ড নোটটি তুহিনের হস্তে, দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ একটি চিরকুট আকারে, একটি পেপার পত্র, মাটির রাস্তায় পরল। শ্রাবণ লক্ষ্য করে তা তুলে নিলো। গোপনে নিজের পকেটে রাখল দুই বন্ধুর অজ্ঞাতে। কারণ শ্রাবণ তার দুই বন্ধুকে কোন ঝামেলায় জড়াতে চায় না। শ্রাবণ বুঝতে পেরেছিল, নিশ্চয়ই এটা ডলির কোন পত্র। প্রতিদিনের জীবন প্রবাহের রুটিন অনুযায়ী, রাতের পড়াশোনা, সালাত, খাওয়া-দাওয়ার পর্ব সেরে, শ্রাবণ দেহটাকে বিছানা নিকট সমর্পণ করে। হঠাৎ ডলির  চিঠির কথা সহসা মনে উঁকি দিল। কি সেই কাগজ, তাতে কি লেখা আছে? পরম কৌতুহলে প্যান্টের পকেট হতে, চিঠি বের করে পড়া শুরু করলো।
চিঠির ভাষা এমন, শ্রাবণ তুমি কেমন আছো? নিশ্চয় ভালো। মনের অজান্তেই এই মন প্রাণ তোমায় সঁপেছি। হারাবার ত্রাস, আর নারীসূলভ লাজুকতায় মুখ ফুটে বলতে পারেনি, আমার না বলা কথা। প্রথম দর্শনে, তোমায় ভালোবেসেছিলাম। তোমার সরল পূর্ন ব্যক্তিত্বে আমি মুগ্ধ। আমার পিতার অনেক কিছুই আছে, আমি তার একমাত্র সন্তান। তুমি যদি আমাদের প্রচলিত সনাতন ধর্ম গ্রহণ করো, তবে আমাকে পাবার সাথেই, পেয়ে যাবে আমার পিতার সমস্ত সম্পত্তি। তোমাকে আর অভাবের সাথে না যুদ্ধ করতে হবে, আর নাইবা কাটাতে হবে মানবেতর জীবন। আমি তোমার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। ভেবে দেখো। শুভেচ্ছান্তে, ডলি রানী ঘোষ। কাকৈরতলা, হরিপুর।
শ্রাবণ কল্পনাও করতে পারেনি, ডলির এমন অবাস্তব চিঠির ভাষা। এ কেমন তার অন্যায় অবান্তর আবদার?
ভালোবাসা সে জানে, সকল বাধা বিপত্তির ঊর্ধ্বে তার বসবাস। জীবনসঙ্গী মনোনয়নে আছে শত সহস্র চাওয়া পাওয়ার নিলাম চুক্তি। ডলি সীমাহীন পাপ মূলক যে প্রস্তাব এনেছে, তা মেনে নেওয়া বা কিঞ্চিত মনে ধারণ করা, বিশ্বের কোন মুসলিম সন্তানের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। শ্রাবণ প্রচন্ড ঘৃণাভরে চিরকুটটি খন্ড বিখন্ড করে ফেলে দিল। সারারাত ভালো ঘুম আর হলোনা। সে জানে, কাল কলেজে  নিশ্চয়, ডলি তার কাছে জানতে চাইবে তার কাঙ্ক্ষিত হৃদয়ের উত্তর?
শ্রাবণ স্বাভাবিকভাবে কলেজে গমন করে। অনুশীলনে মত্ত হয়ে আছে। ডলি প্রতিটি ক্লাসেই শ্রাবণের সংস্পর্শে আসার বারংবার চেষ্টা করতে লাগলো। শ্রাবণ বিভিন্ন অজুহাত দিয়েও পরিত্রাণ পেলোনা। টিউবওয়েলে  হাতমুখ ধোবার স্থানেও ,ডলির রানী হাজির। দুষ্ট ভরা কাশি এনে বলল, স্যার, আপনার সাথে একটু কথা ছিল?
—খুব জরুরী বুঝি?
—হ্যা জনাব।
মুখের জল রুমালে মুছতে মুছতে শ্রাবণ বললো, চলো ওই অর্জুন গাছের ছায়ায় গিয়ে বসি। কলেজের এই পাশ টুকু  এখন নিরিবিলি। শ্রাবণ ঠোঁটে শুষ্ক হাসি নিয়ে বলল কি বলবে বলো?
–আমার চিঠিটা পড়েছ তুমি?
—হ্যাঁ পড়েছি।
ডলি আতঙ্ক দৃষ্টিতে, ছল ছল নয়নে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ গম্ভীর, অথচ দৃঢ় শান্ত চিত্তে, দলের দিকে সহানুভূতি এনে বলল,
দেখো ডলি, বন্ধু হিসেবে, একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে, আমি তোমাকে যতখানি পছন্দ করি, ততটুকু শ্রদ্ধা করি। আমার স্পষ্ট বক্তব্য হয়তো তোমাকে সাময়িক, অভিমানী করে তুলবে। তাতে আমি কুন্ঠিত নই। সাময়িক আশা দেখিয়ে, আমি পারবোনা, তোমাকে ইহকালে পরকালে দুই কালে, তোমাকে চিরদুখী করতে। তোমার আবদার আমি কেনো, বিশ্বের কোন মুসলিম সন্তানের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। তোমার পিতার সম্পত্তি কেন, দুনিয়ার সম্পত্তির বিনিময়ে নয়। আমি ওই স্রষ্টার পদতলে অশেষ শুকরিয়া আদায় করি যে, তিনি আমায় ইসলাম ধর্মের অনুসারী করেছেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিলগ্ন হতে, আজও অবধি তুমি কি পারবে, অন্তত একটি নজির উপস্থাপন করতে, কোন মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ অথবা খ্রিস্টান হয়েছে? একজন যদি জগত কুখ্যাত পাপী ও হন, তথাপি সে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার ন্যূনতম স্পর্ধা সে মনের ভুলে করবেনা। অথচ আমি তোমাকে, একটি নয় একাধিক ,হাজার নয় তারও অধিক, নজির হাতে কলমে দেখাতে পারব, তুমিও জানো অনেক বিধর্মী যুগে যুগে সত্য ধর্ম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ইসলামকে কবুল করেছেন। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় নিজেদের জানমাল সম্পদ সবই সমর্পণ করে, নিজেদের ইহকাল ও পরকালে ধন্য করেছেন। শ্রাবনের কথার কোন জবাব ডলি রানীর জানা নেই। অঝোর ধারায় শ্রাবণের সামনে, শ্রাবণ ধারায় অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলো। শ্রাবনের ভাবনায় ছিলনা, ডলি তার হাত দুটো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগলো, শ্রাবণ তোমার যুক্তি মিথ্যা নয়। তবে আমি যেসব বাঁধা ছাড়িয়ে ,শুধু তোমার হতে চেয়েছি। তুমি হয়তো জানো না, নারীরা একবার যাকে মন দেয় তাকে ভুলে যায়না।
কবিগুরু যথাযথ বলেছেন, এরা নারী, এরা যুক্তি বোঝেনা। সর্বত্র চোখের জলে জিততে চায়।

বাকি পর্ব পড়ুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *