সাকিব আহমেদ : প্রেমই শ্রেষ্ঠ, প্রেমই শান্তি, প্রেমের কারণেই এ জগৎ সৃষ্টি। প্রেম হচ্ছে ঈশ্বরের ঐশ্বর্য এক শক্তি, যে শক্তি ছাড়া প্রাণকুলের জন্ম বৃথা তথা প্রেম ব্যতিত প্রাণকুলের জন্ম হতো না।
ঈশ্বরের প্রেমের কৃপায় আনুমানিক ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে ধোঁয়াশাময় অবস্থা থেকে পৃথিবী ও প্রাণের বিকাশ ঘটে। মহান ঈশ্বর সৃষ্টির সূচনালগ্নের আগ মুহূর্তে সম্ভবত প্রেম সৃষ্টি করেছিলেন। অন্যথায় ঈশ্বরের প্রেম না থাকলে তিনি এসব কিছু সৃষ্টি করতেন না। পৃথিবী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তার এ প্রেমের কারণে আজ আমরা, প্রাণীকুলের জন্ম হয়েছে। মহান ঈশ্বরের প্রেম না থাকলে তিনি আমাদের সৃষ্টি করতেন না!
মুসলিম হাদিস অনুসারে,”আল্লাহ তা’আলা রহমতকে ১০০ ভাগে বিভক্ত করেছেন। তার মধ্যে ৯৯ ভাগ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন এবং পৃথিবীতে মাত্র ১ ভাগ নাজিল করেছেন। এই ১ ভাগ রহমতের কারণেই সমস্ত সৃষ্টি একে অপরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করে।” — (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬০০০)
মহান খোদা চাইলে এ ১-ভাগ রহমত উঠিয়ে নিতে পারেন এবং পৃথিবী থেকে প্রাণীর প্রতি দয়া-মায়া,প্রেম-ভালোবাসা সকল কিছু মুছে দিতে পারেন। তার ভেতর প্রেম থাকায় এবং প্রাণীকুলের মধ্যে প্রেম সৃষ্টির জন্যই তিনি আমাদের উপর এক ভাগ রহমত রেখেছেন।
বিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষ মানুষের প্রতি প্রেম মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। যা মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন, অক্সিটোসিন ও এন্ডোরফিনের মতো হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের প্রবাহের ফলে অনুভূত হয়। বিজ্ঞান বলে, মস্তিষ্কে রাসায়নিক ক্রিয়ার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে প্রেম সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান প্রেমকে ”প্রাকৃতিক ড্রাগ” বলে অভিহিত করে। প্রেম মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের একটি রাসায়নিক অবস্থা যা বিবর্তনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করা হয়।
স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং প্রেমের সম্পর্ক। ঈশ্বর তার প্রেম কোনো পক্ষপাতিত্ব করেন না। সৃষ্টিকর্তা জীব ও প্রকৃতির প্রতি প্রেমময়, যা তাঁর অন্যতম প্রমাণ হিসেবে মহান ঈশ্বর এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তার প্রেম নিঃস্বার্থ ও চিরস্থায়ী, যার ফলে আমরা আমাদের একটি জীবন পৃথিবীতে কাটিয়ে দিতে পারছি।
বিজ্ঞানের মতে, “মানুষের টিকে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে জৈবিক আকর্ষণ থেকে প্রেমের উৎপত্তি। যা মানবজাতির শুরু থেকেই মানুষের সাথে জড়িয়ে আছে।” সৃষ্টির সূচনালগ্নে সৃষ্টিকর্তা মানবদেহে প্রেম সৃষ্টি না করলে মানবজাতির জৈবিক আকর্ষণ এলো কোথা থেকে?
তবে এ জৈবিক আকর্ষণই কি প্রেম? জৈবিক আকর্ষণ (Biological Attraction) প্রেমের একটি অপরিহার্য অংশ এবং শুরুর ধাপ, কিন্তু প্রেম কেবল জৈবিক আকর্ষণ নয়। প্রেম হচ্ছে জৈবিক তাড়না, মানসিক সংযোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী আবেগের একটি জটিল মিশ্রণ। জৈবিক আকর্ষণ হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, অন্যদিকে প্রেম মানসিক ও সামাজিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত গভীর ভালোবাসার পবিত্র একটি বন্ধন। মানুষের আকর্ষণ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু প্রেম সুদৃঢ় এক পবিত্র বন্ধন, যা শুধু দৈহিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে না একজন মানুষের দায়িত্ব, কর্তব্য, সম্মান প্রকাশ পায় কেবল প্রেমের মধ্যেই।
সনাতন ধর্মশাস্ত্র অনুসারে, এ মহাবিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে ঈশ্বর তার প্রেম প্রকাশ করেছেন। প্রেমকেই সৃষ্টির মূল ভিত্তি বলে গণ্য করা হয়। প্রেম জীবাত্মার (individual soul) সাথে পরমাত্মার (Supreme Soul) মিলনের বহুমাত্রিক পথ যেখানে সাধক নিজের অহং বিসর্জন দিয়ে পরম সত্তার সাথে প্রেমের মাধ্যমে একাত্ম হন। সনাতন বিশ্বাস অনুসারে, ব্রহ্ম (ঈশ্বর) যখন ‘একা’ থেকে ‘বহু’ হতে চাইলেন, তখন তার ইচ্ছাশক্তি বা সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাই হলো প্রেমের আদি রূপ। সনাতন ধর্মে সর্বোচ্চ প্রেম হলো ‘ভক্তি’। মানুষ যখন পরমাত্মার প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা অনুভব করে, তখন এ প্রেমের সৃষ্টি হয়। এটি কেবল নারী-পুরুষের প্রেম নয়, বরং আত্মার সাথে পরমাত্মার প্রেম।
বাউল তত্ত্বে, জীবের প্রতি ভালোবাসাই হচ্ছে স্রষ্টাকে ভালোবাসা। তারা বিশ্বাস করেন মানুষের মাঝেই স্রষ্টার বাস। দেহ ও আধ্যাত্মিকতায় বাউলরা শরীরকে “ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিরূপ” মনে করেন। তাদের মতে, কেবল জাগতিক প্রেমের (দেহজ প্রেম) মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক বা দিব্য প্রেমে পৌঁছানো সম্ভব। বাউল তত্ত্বে, প্রেম কেবলমাত্র সাধারণ কোনো মোহ নয় বরং প্রেম একটি গভীর সাধনা। বাউল সাধক মহাত্মা লালন সাঁইয়ের দর্শন অনুসারে কেবল প্রেমই মুক্তির পথ। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র সকল ধরণের জাতিগত বিভেদ ভুলে মানবতার প্রেম (Love of humanity) কে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার গানে গভীর জীবন দর্শন, দেহতত্ত্ব ও মানবের প্রতি প্রেম পাওয়া যায়। দার্শনিক মহাত্মা লালন সাঁইয়ের দর্শনশাস্ত্রে কেবল “প্রেম” ছিল প্রধান ধর্ম, প্রেমই ছিল গভীর সাধনা।
সনাতন দর্শন অনুসারে, প্রেমের বহু রূপ আছে। নিজের আত্মার প্রতি ভালোবাসা যা থেকে অন্যের প্রতি ভালোবাসার জন্ম হয় তা হচ্ছে, আত্মপ্রেম। ঈশ্বরের প্রতি প্রেম হচ্ছে, ভক্তি। মানবের প্রতি প্রেম, মৈত্রী। নারী-পুরুষের ভালোবাসার পবিত্র রূপ, শৃঙ্গার। কাম হচ্ছে সংসারের প্রয়োজনে সৃষ্টি আদি প্রেম। আত্মা এবং পরমাত্মার মধ্যে প্রেম হল পূর্ণাঙ্গ প্রেম।
প্রেমের সৃষ্টি বা ভালোবাসার অনুভূতি মানুষের অস্তিত্বের মতোই প্রাচীন, যা খ্রিষ্টপূর্ব যুগ বা মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই বিদ্যমান। প্রেম কেবল একটি মানবিক অনুভূতি নয়, বরং এটি একটি আদিম শক্তি। যা সৃষ্টির প্রতিটি কণা, এমনকি আমাদের শরীরের কোষের মধ্যেও বিদ্যমান। প্রেমই কেবল জীবকে পরমাত্মার দিকে ধাবিত করে এবং প্রেমই কেবলমাত্র ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক বাংলাপত্র ম্যাগাজিন।





















