মোফাজ্জল হোসেন : বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে খবরের সত্য-মিথ্যা যাচাইকরণ সাধারণ জনগণের জন্যে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচার হওয়া তথ্যকে যে নির্ভরযোগ্য মনে করবো, সে সুযোগও এখন আর নেই। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো জন্ম নিচ্ছে লাইসেন্সবিহীন সংবাদ মাধ্যম, যা দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে ফেলছে নির্ভরতা, প্রচার করছে নিয়মিত ভুল তথ্য। আর এই ভুল সংবাদ প্রচারে সাংবাদিকতা পেশাকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, তেমনি ভুল সংবাদের স্বীকারে ভোক্তার জীবনেও নেমে আসছে কালোছায়া।
উল্লেখ্য ‘তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে’র আওতাধীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের নিবন্ধন শাখার প্রকাশিত প্রতিবেদনানুযায়ী- ২০১৮ সালের জুন মাসে মোট নিবন্ধন পত্র-পত্রিকা ছিলো ৩০৬১টি। এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সালের হিসেবানুযায়ী- নিবন্ধিত পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ৩২১০টি (অনলাইন গণমাধ্যম ব্যতীত)। এর মধ্যে দৈনিক পত্রিকা ১৩০৯টি, অন্যান্যের মধ্যে রয়েছে অর্ধ-সাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, দ্বি-মাসিক, ত্রৈ-মাসিক ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে সংখ্যাধিক্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও মাধ্যম।
২০২৫ সালেই রেকর্ড সংখ্যক ভুলের সংখ্যা ৪১৯৫টি, যা আগের বছর অর্থাৎ ২৪ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এছাড়াও চলতি বছরের মার্চে ৪৭২টি ও এপ্রিলে ৪২৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা মোট ভুলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০০টি, মাত্র দু’মাসে।
সচরাচর এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করেই আমরা দেশ ও দেশের বাহিরের খবরা-খবর জেনে থাকি, এবং এই খবর প্রকাশের মাধ্যমগুলোকেই আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে ধরে নেই। অথচ এখন দ্রুত খবর প্রকাশের প্রবণতা বা ট্যাপে পড়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো ভুল খবর প্রকাশ করছে এবং সাধারণ জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে মনে দ্বিধা বা সন্দেহ তৈরি করছে।
আমরা জানি সর্বশেষ তথ্যমতে, জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ৩৬ লক্ষ ১০ হাজার। এই অধিক সংখ্যক মানুষগুলোও বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যমে ভুল খবরগুলো দেখছে এবং কোনো সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই তারা নিজেদের প্রোফাইলে সেগুলো শেয়ার দিচ্ছে। যার নেতিবাচক দিক ছড়িয়ে পড়ছে সর্বোত্রে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান “রিউমর স্ক্যানারে’র তথ্যমতে- দেশে ভুল খবর ও অপতথ্যের প্রচার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই ভুলগুলোর পিছনের কারণ হিসেবে আমরা খুজেঁ পায়, দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রবণতা বা উদ্দ্যেশ্য প্রণোদিত মনোভাব অথবা দায়িত্বশীলতায় অবহেলা।
এই ট্যাপ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে, অবশ্যই দ্রুত সংবাদ প্রচারের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে সংবাদ প্রকাশে সত্য ও নির্ভর যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ফ্যাক্টচেকিং বা সত্যতা যাচাই করেই তা প্রচার করতে হবে, এতে ভুল খবর প্রচার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অনিবন্ধিত সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিজ্ঞ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে এবং সংবাদ মাধ্যমগুলো ভুল খবর প্রকাশ করলে তাদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী, সাংবাদিক ভুল সংবাদ প্রচার করলে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা ও কারো বিরুদ্ধে মিথ্যে তথ্য দিলে মানহানি আইন দণ্ডবিধির ৫০০ ধারানুযায়ী দু’বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো ইঁদুর দৌড়ে পা বাড়াতে ভয় পাবে এবং ভুল সংবাদ প্রচারেও সতর্কতা অবলম্বন করবে বলে আশাবাদী।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।





















