মো: রনি চৌধুরী : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এক প্রাচীন ও গৌরবোজ্জ্বল জনপদ নোয়াখালী। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের সুষম বন্টন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দৌড়ে এই অঞ্চলটি এখনো তার প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে একটি পৃথক প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে এ অঞ্চলের আপামর জনতা। বর্তমান সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় এবং জনসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যের সাথে এই দাবি সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
নোয়াখালীকে বিভাগ করার দাবি কেবল আঞ্চলিক আবেগ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে অকাট্য ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক যুক্তি। বর্তমানে বৃহত্তর নোয়াখালীর (নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর) সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো প্রশাসনিক কাজেও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিরই অপচয় ঘটে। নোয়াখালীকে বিভাগীয় সদর দপ্তর করা হলে এই তিন জেলাসহ চাঁদপুর ও নিকটবর্তী অঞ্চলের কোটি মানুষের ভোগান্তি লাঘব হবে।
নোয়াখালী অঞ্চলকে বলা হয় দেশের ‘রেমিট্যান্স হাব’। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এই অঞ্চলের প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া এখানকার কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণ শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিভাগীয় শহর হিসেবে অবকাঠামো উন্নত হলে এখানে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে নিঝুম দ্বীপ ও হাতিয়াকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা বিকশিত করতে বিভাগীয় স্তরের প্রশাসনিক তদারকি অত্যন্ত জরুরি।ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নোয়াখালী একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মোকাবিলা করতে হয় এ অঞ্চলের মানুষকে। একটি বিভাগীয় কাঠামো থাকলে দুর্যোগকালীন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উপকূলীয় বাঁধ সংস্কারের মতো কাজগুলো সমন্বিতভাবে করা সম্ভব হবে।
নোয়াখালীর বিশাল চরাঞ্চলকে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তর করতে হলেও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন।বিভাগীয় শহর হলে এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালীর মানুষকে ঢাকা বা চট্টগ্রামের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে জরুরি রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।সমালোচকরা অনেক সময় দূরত্বের দোহাই দেন, কিন্তু প্রশাসনিক বিভাগ কেবল দূরত্বের বিষয় নয়; এটি মূলত উন্নয়ন ও সেবার সমবন্টনের বিষয়।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করা এখন জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।নোয়াখালী বিভাগ গঠন এখন কেবল জনদাবি নয়, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে একটি বাস্তবসম্মত প্রয়োজন। বীর প্রসবিনী এই মাটির সন্তানদের অবদানকে মূল্যায়ন করে এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত নোয়াখালীকে বিভাগ ঘোষণা করবে—এটাই আজ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষার্থী, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি,চট্টগ্রাম।





















