মিথিলা জসিম তন্নি : মে মাসের প্রথম সকাল এলেই পৃথিবীর আকাশে যেন লাল রঙের এক স্মৃতি উড়ে বেড়ায়। সে স্মৃতি ঘামে ভেজা হাতের,অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত জীবনের, অধিকার আদায়ের দুর্বার শপথের। হেমার্কেট অ্যাফেয়ার-এর রক্তমাখা পথ ধরে জন্ম নিয়েছিল মে দিবস।
মে দিবস শ্রমের মর্যাদা ও মানুষের ন্যায্য অধিকারের অনন্ত প্রতীক। ইতিহাস আজও সেই সংগ্রামীদের সালাম জানায়। কিন্তু এই গৌরবের উৎসবের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা -নারী শ্রমিকদের নীরব দীর্ঘশ্বাস। যে নারী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কারখানায় কাজ করেন, ঘরে ফিরে সামলান সংসারের অসংখ্য দায়িত্ব তার শ্রমের হিসাব অনেকের কাছেই থাকে না। গার্মেন্টস, কৃষিখামার,চা বাগান, ইটভাটা, গৃহকর্ম কিংবা আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত নারীরা আজও সমমজুরি থেকে বঞ্চিত। নিরাপত্তাহীনতা ও অবহেলার শিকার, কর্মস্থলে সম্মানহানি,ঘরে অদৃশ্য দায়িত্ব দুই চাকার ভার যেন একাই বহন করতে হয় তাদের।
বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার। দেশের মোট নারী শ্রমিকের বড় একটি অংশ (প্রায় ৭০%) পোশাক শিল্পে জড়িত, যা দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানি খাত এবং প্রায় ১৮ লাখ নারী গৃহভিত্তিক কাজের সাথে যুক্ত আছেন। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষাধিক। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮.৪০% (২০২৪ অনুযায়ী), যা ২০২২ সালে ৪২.৮% ছিল। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে, বিশেষ করে পোশাক ও কৃষি খাতে নারী শ্রমিকরা প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। ২০২৬ সালের শ্রমিক সংগঠনগুলো “শ্রমিক ইশতেহার ২০২৬” প্রকাশ করে। যেখানে নারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা যোদ্ধা কিন্তু কোথাও পূর্ণ স্বীকৃতি পান না। মে দিবস শুধু অতীতের বীরত্বগাঁথা নয় বর্তমানের বিবেকও। যে দিন শ্রমিকের জয়গান গাওয়া হয় সে দিন নারী শ্রমিকেরও জয়গান গাওয়া দরকার। কারণ সভ্যতার প্রতিটি ইট গাঁথা হয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের হাতের স্পর্শেই। মে দিবসের মঞ্চে উচ্চারিত স্লোগান যখন আকাশ কাঁপায় তখন প্রশ্ন জাগে নারীর শরীরের ঘাম কি কম মূল্যবান? তার পরিশ্রম কি ইতিহাসের বাইরেই থেকে যাবে?
আমাদের সমাজে নারীর অনেক শ্রমকে ‘দায়িত্ব’ বলে ছোট করে দেখা হয়, ‘কাজ’ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। অথচ এই অদৃশ্য শ্রমের উপরই দাঁড়িয়ে আছে দৃশ্যমান সভ্যতা। নারীর হাত যেন মাটির নিচে পরে থাকা শিকরের মতো।কিন্তু নারী ঘর সামলান বলেই কেউ নিশ্চিন্তে কর্মস্থলে যেতে পারছেন।একজন মা ত্যাগ স্বীকার করেন বলেই একটি প্রজন্ম শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারছে। একজন নারী শ্রমিক কারখানায় ঘাম ঝরান বলেই অর্থনীতির চাকা ঘোরে। মে দিবস তাই শুধু কারখানার ধোঁয়া আর শ্রমিকের মিছিলের দিনই নয়, এটি সেই নারীদেরও দিন, যারা প্রতিদিন নিজেদের স্বপ্নকে আড়াল করে স্বামী,সন্তানদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন। তাদের ক্লান্ত হাতে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা আর নীরবতায় থাকে সহিষ্ণুতা।
আজ প্রয়োজন নারীর শ্রমকে করুণা নয়, মর্যাদা দিয়ে দেখা। প্রশংসা নয়, প্রাপ্য অধিকার দেওয়া। সাময়িক সম্মান নয়, স্থায়ী স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। কারণ সমাজের দৃশ্যমান সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য হাতের অনন্ত অবদান। তাই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, গৃহশ্রমের মূল্যায়ণ এবং সামাজিক সম্মান -এসবই হওয়া উচিত মে দিবসের প্রকৃত অঙ্গীকার। যে হাতগুলোকে আমরা অদৃশ্যভাবে উপেক্ষা করি সেই হাতগুলোর স্পর্শেই তো প্রতিদিন নতুন ভোরের জন্ম নেয়।
একজন নারী দিনের শুরু করেন সবার আগে কিন্তু শেষ করেন সবার পরে। তার সকাল শুরু হয় রান্নাঘরের ধোঁয়া, সন্তানের যত্ন, পরিবারের প্রয়োজন আর দায়িত্বের ডাকে। তারপর অনেকেই ছুটে যান কর্মক্ষেত্রে -কারখানায়,চা বাগানে,অফিসে,মাঠে হাসপাতালে কিংবা বিদ্যালয়ে। দিনশেষে আবার ফিরে আসেন সংসার নামক কর্মশালায়। অথচ এই দীর্ঘ পরিশ্রমের কতটুকুই বা আমরা স্বীকার করি। দুঃখজনক হলো এই শ্রমকে অনেক সময় ভালেবাসা,কর্তব্য বা দায়িত্বের আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয়।যেন নারীর শ্রম স্বাভাবিক, তার ক্লান্তি গুরুত্বহীন, তার অবদান অনুল্লেখ্য। আমরা একটিবারের জন্যও ভাবি না সেও মানুষ, সেও ক্লান্ত হয়, তারও বিশ্রামের প্রয়োজন আছে, তারও স্বপ্ন আছে, তারও সম্মানের অধিকার আছে। নারীর শ্রম শুধু অবদান নয়, তা সভ্যতার শ্বাস-প্রশ্বাস। মে দিবসের স্লোগানে অবহেলিত নারীর শ্রমের কথাও উচ্চারিত হওয়া চাই। নারীর শ্রমের কথা উচ্চারিত হলেই মে দিবসের গৌরব পূর্নতা পাবে।
লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।





















