মোজাহিদ হোসেন
সেদিন রানাকে তার বন্ধু রাজু এসে বলল, “বিরাট মেলা বসবো, ঐখানে মেলা লোক আইবো, ঐখানে যেতে হইবে, অনেক ফুল, বেলুন বিক্রি হইবে”। কথা শুনে রানা অবাক হলো। কি মেলা হবে, রানা জানে না। রানা আগেই মাঠ দেখে আসতে চাইলো। রানা-রাজু মাঠ দেখতে গেল। অনেক বড় মাঠ সজ্জিত করে সাজানো হয়েছে, চারদিকে অনেক মানুষের আনাগোনা চলছে, অনেক দোকানও ইতিমধ্যে চলে এসেছে। রানা, রাজুকে জিজ্ঞেস করল, এইখানে কি হইবে? রাজু আগেই খোঁজ নিয়েছিল। বললো,
-এইখানে পহেলা বৈশাখের মেলা বসবো
পহেলা বৈশাখ কি?
-এইদিন থেইকা নতুন বৎসরের শুরু।
এইদিন কি হয়?
-কি হয়, সেইটা কেমনে কমু, কাল আসলে দ্যাখোন যাইবো।
রানার মনে প্রশ্ন জাগে, এদিন কি হয়?
রানার কৌতুহল দেখে রাজু এক লোকরে জিজ্ঞেস করে,
এইখানে কি হইবো?
-এখানে বৈশাখী মেলা হবে। এটি একটি বাঙালি উৎসব মেলা, যা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরে আয়োজিত হয়। এটি একটি সার্বজনীন উৎসব, যা বর্তমানে বাংলাদেশের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসী কর্তৃক প্রচুর পরিমাণ বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের সাথে আয়োজন করা হয়।
এই উৎসবটি শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল “শুভ নববর্ষ”। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
সব কথা রানা রাজু কেউ বুঝতে পারে না।
রানা বললো এইখানে কি পাওয়ন যায়?
বৈশাখী মেলায় অনেক কিছু পাওয়া যায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্য, মাটির শিল্প, কুটির শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহার থাকে। মাটির পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী, পাটের পণ্য, কাঁচের চুড়ি, আলতা, শাড়ি, লুঙ্গি, এবং মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, কদমা, জিলাপিসহ নানারকম মুখরোচক খাবার পাওয়া যায়।
রানা সবকিছু বুঝতে না পারলেও বুঝতে পারে বড় মেলা হইবে। অনেক মানুষ আসবে। খুব ভোরে উঠে ফুল বেলুন নিয়ে আসতে হইবে। অনেক বিক্রি হইবে।
এরপর তারা দুজনে চলে যায় রেল স্টেশনে। তাদের দুজনেরই বাড়ি নেই, ঘর নেই, নেই পরিবার। রেলস্টেশনেই থাকা, রেলস্টেশনে খাওয়া এবং তাদের কাছে রেলস্টেশনেই যেন বাড়ি হয়ে উঠেছে। কাজ হিসেবে তারা ফুল আর বেলুন বিক্রি করে। এভাবে সারাদিন যা আয় হয় কোনরকম নিজের পেট চালায়।
তারা মেলায় বিক্রির জন্য ফুল বেলুন নিয়ে আসে। সারা রাত মনে আঁকুবাকু করে আগামীকাল অনেক বিক্রি হবে। হয়তো ভালো কিছু খাইতে পারবো, ছেঁড়া আগের পুরোনো ছেঁড়া প্যান্ট শরীর দেখা যায়। নতুন একটা যদি প্যান্ট কিনতে পারি! বেশি বিক্রি হলে সাথে একটা গেঞ্জি! একটা প্যান্ট আর একটা গেঞ্জি আজ কতদিন ধরে চলছে জানে না। অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। তবুও সেটাই পড়তে হয়।
ছেঁড়া কাপড় পরেই রানার আজ বয়স ১০বছর। আর রাজুর ১৪ বছর। তারা আপন ভাই না। কিন্তু রেলস্টেশনে দীর্ঘদিন থাকায় দুজনের মধ্যে আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেছে। কেউ কাউরে ছাড়া কোথাও যায় না। যা করে একসাথে। তাদের অবস্থা একই। তারা তাদের বাবা মাকে চিনে না, জানে না।
এরপর রাত শেষ হয়ে সকাল হলো। স্টেশনের মসজিদ থেকে দুজনে পানি খেয়ে বেরিয়ে পড়ল। সাথে ফুল আর বেলুন। দুজনে মাঠে চলে গেল। চারদিক কাপড় দিয়ে সাজানো, বিভিন্ন রঙের কাপড়, বাতি। আবার একেকজন একেক রকম পাঞ্জাবি-শাড়ি পড়ে আসছে। সবার কাপড়ে ঢোল-তবলা আঁকানো। আবার কি যেন লেখা। সেই লেখা রানা পড়তে পারে না। একটা ছোট বাচ্চা কান্না করতেছিল বেলুন নেওয়ার জন্য। তার বাবা রানার কাছে দুইটা পেলুন কিনে নিল।
রানা আর রাজু মাঠে ভিতরের দিকে এগিয়ে গেল। দেখল তাদের বয়সী অনেক ছেলেমেয়ে সুন্দর জামা, পাঞ্জাবি-শাড়ি পড়ে আসছে, তাদের বাবা-মায়ের সাথে। কেউ আসছে বোনের সাথে কেউ বড় ভাইয়ের সাথে। রানা এগিয়ে গেল। দেখে ভিতরে কিসের যেন দোকান। আরো এগিয়ে গেল। রানা অবাক হয়ে গেল। দেখলো সেখানে পান্তা ভাতের দোকান। পান্তা ভাত রানার বেশ পরিচিত। ভালো বিক্রি হলে রেলস্টেশনের পাশের দোকান থেকে পান্তা ভাত খেত তারা। ভালো পান্তা নয়। অনেক সময় হোটেলের ভাত নষ্ট হতো, সেগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে পান্তা করে খায়, কাঁচা মরিচ দিয়ে। ভারি মজা।
এখানে এসে রানা দেখল এত বড়লোক নতুন পোশাক পড়া সবাই। তবুও এখানে পান্তার দোকান কেন? পান্তা কে খাবে? রানা রাজুকে প্রশ্ন করে এখানে পান্তা ভাত কি আমাদের দিবে? রাজু উত্তর দেয় এখানের পান্তা অনেক দামি।
অনেক প্রশ্ন আর কৌতুহল নিয়ে রানা দোকানের আশপাশে ঘুরেই বেলুন বিক্রি করে। অনেক ছেলেমেয়ে রানার কাছ থেকে গোলাপ ফুল কিনে নেয়। ছোট বাচ্চারা ছেলেমেয়েরা বেলুন কিনে নেয়। রানা- রাজুর দুজনেরই ভালো বিক্রি হয়। কিছুক্ষণ পর রানা দেখলো একজন বড় গাড়ি থেকে নেমে পান্তার দোকানে গেল, সাথে তার স্ত্রী, দুইটা বাচ্চা। রানা ভাবছিল এতো বড় মেলায় পান্তার দোকান দিয়েছে, এই দোকান উঠায় দিবে মেলা থেকে। কিন্তু তা নয় সেখানে গিয়ে বসে পান্তা খেতে চাইলো। রানা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল এত বড় মানুষ পান্তা খাবে কেন? পান্তা ভাত তো আমাদের জন্য! একটু পরে রানা দেখলো উনারা পান্তা ভাত খায় সাথে বড় বড় মাছ। রানা বুঝতে পারল আমরা পান্তা খাই মরিচ আর লবণ দিয়ে, তারা খায় বড় মাছ দিয়ে। রানা রাজুর সাথে দেখা করে বলল, দ্যাখ দ্যাখ এত বড় মানুষ পান্তা খাচ্ছে!! রাজু বললো এদিন নাকি সবাই পান্তা খায়। রানা বলে আজ তো অনেক বিক্রি হবে, স্টেশনের দোকানে আমরাও পান্তা খাবো!
একটু পরেই তারা একটা মিছিল দেখতে পায়। রাজু শুনেছে শোভাযাত্রা বলে কি যেন হয়। দেখে রাজু ঠিক করে এটাই শোভাযাত্রা হতে পারে। রানাকে বলে এটা মিছিল না, শোভাযাত্রা। সবাই বলে এসো হে বৈশাখ! সবার মাথায় লেখা ওয়ালা কাপড় বাঁধা। রানা লেখাটা পড়তে পারেনা। রানারও ইচ্ছে করে এরকম কাপড় পেলে সেও মাথায় বাঁধবে। রাজু বলে মিছিল করে সবাই পান্তা খায়। এর আগে রানা আর কোথাও বৈশাখের মেলায় যায়নি। রাজু এসেছিল। তাই রাজুর অভিজ্ঞতা আছে। রাজু বলে এরপর এখানে নাচ হইবে, গান হইবে, বড় বড় মানুষেরা মাইকি কথা বলবে।
শোভাযাত্রায় হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে একটা কাপড় পরে দেখে রানা তুলে দেখে সবাই যে কাপড় মাথায় বেঁধেছিল সেই কাপড়। কাপড়টি কুড়িয়ে রাজুকে বেঁধে দিতে বলে। রাজু তার মাথায় সেই কাপড় বেঁধে দেয়। তখন রানার মনে এক অসম্ভব আনন্দ জাগ্রত হয়। বড় বড় লোকেরা যে কাপড় বেধেছে সেও একই কাপড় বেঁধেছে। মনে মনে সে আনন্দ পায়, নিজেকে বলে তারও মিছিলে যাওয়া উচিত। মিছিলে গেল, একদম পিছনে। মিছিল শেষ করে সবাই মাঠে চলে এসে মঞ্চের চেয়ারে বসে। রানা যেতে পারে না। সে ফুল আর বেলুন বিক্রি করে। এরপর বড় বড় মানুষেরা মাইকে কথা বলে। একজন বলেছিল,
“বৈশাখী মেলার ইতিহাস মুঘল সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) আমল থেকে শুরু, যখন ফসলি সন (বাংলা ক্যালেন্ডার) চালুর পর চৈত্র মাসের শেষে খাজনা পরিশোধ করে পহেলা বৈশাখে হালখাতা ও উৎসবের প্রচলন হয় । গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে উঠে আসা এই মেলা এখন বাঙালির বর্ষবরণ ও সর্বজনীন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ”।
কথাগুলোর সবকিছু রানা বুঝতে পারেনা। রাজু একটু একটু বুঝতে পারে।
কিছুক্ষণ পরে রানার বয়সী ছেলেমেয়েরা সুন্দর সুন্দর পোশাক পড়ে কেউ নৃত্য করে, কেউ গান গাচ্ছিল। কিন্তু রানার হাতে ফুল আর বেলুন নিয়ে বিক্রি করে আর গান শুনে। এভাবে সারাদিন কেটে যায়। তারা সকালে খায়নি, দুপুরেও খায়নি ৷ একথা ভুলেই যায়। বিকেল হলে তারা রাস্তার পাশের দোকান থেকে পাউরুটি কিনে নিয়ে খায়। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত বেলুন বিক্রি করে। ফুল সব বিক্রি হয়ে গেছে। কিছু বেলুক বাকি রয়েছে। আজ অনেক বিক্রি হয়েছে। অনেক টাকা হয়েছে। এই টাকা দিয়ে রানা-রাজুর অনেক পরিকল্পনা।
স্টেশনে পাশের হোটেলে বসে দুজনে আজ পান্তা খেয়েছে, রুটি খায়নি। আজ তাদের মনে অনেক আনন্দ।
রানা জিজ্ঞেস করে আর কবে এরকম মেলা হইবে? রাজু জানেনা। বলে খোঁজ পেলে জানাবে। বলে এ মেলা বৎসরে একবারই হয়। আরো অন্য মেলা হতে পারে। হলে আবার তারা দুজনে ফুল আর বেলুন বিক্রি করবে। জীবনের প্রয়োজনে জীবন অনেক কিছুর সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়, সে যে কেউ হোক। রাস্তার ছেলে মেয়েরও অনেক আশা থাকে ইচ্ছে থাকে কিন্তু তা অপূর্ণ। প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে হিসাব মেলাতেই দিন শেষ হয়ে যায়। তবুও হিসাব মেলেনা। কি অদ্ভুত জীবন ! এরপর রানা রাজু ঘুমাতে আসে। রাজু ঘুমিয়ে যায়। সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে। শরীর অনেক ক্লান্ত। তবুও রানার ঘুম আসে না। তার ভাবনায় অনেক কিছু আসে। রাত শেষ হলে পুনরায় আগামীকাল রাস্তায় বেলুন ফুল বিক্রি করতে হবে, এজন্য বারবার ঘুমাতে যায় কিন্তু রানার ঘুম আসে না।
রানা ভাবতে থাকে- তার বয়সী ছেলে মেয়েরা কত সুন্দর পোশাক পরে এসেছে। কেউ নৃত্য দিচ্ছিল, কেউ গান গাচ্ছিল। কিন্তু তাকে ফুল আর বেলুন বিক্রি করতে হচ্ছে। তার বয়সী ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের সাথে এসেছে। বাবা মা তাদের আবদার পূরণ করতেছে, যা চাচ্ছে কিনে দিচ্ছি কিন্তু তার ইচ্ছে পূরণ করাবার কেউ নাই। সবাই স্কুলে পড়াশোনা করে কিন্তু রানা মাথায় বাঁধা কাপড়ের লেখায় পড়তে পারেনা। তারও ইচ্ছে করে পড়ালেখা করার। হয়তো সুযোগ পেলে রানা ভালো পড়াশোনা করতে পারতো। কিন্তু রানার সেই সুযোগ নেই। জন্মের পর থেকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে জীবন চলার। রানা ভাবতে থাকে বড় বড় মানুষেরা আজ মেলায় এসে পান্তা ভাত কিনে খেয়েছে অনেক টাকা দিয়ে। কিন্তু তার ভাগ্যে হঠাৎ পঁচা পান্তা জোটে । রানা জন্ম থেকে কোনদিন ভালো নতুন পোশাক পড়েনি। কত ঈদ যায়! কত উৎসব যায়! কিন্তু জীবনের ভাগ্য বদলায় না। উৎসব আসলে ভালো বিক্রি হয়, দুবেলা খাওয়ার চিন্তা থাকবে না এই কথা ভেবে মানসিক শান্তি পায়। এভাবে ভাবতে ভাবতেই অনেক রাত হয়ে যায়। কোন সময় রানার ঘুম আসে এ ভয়ংকর নির্জন শহরের কেউ বুঝতে পারেনা, রানাও বুঝতে পারে না!
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





















