মো: রেদোয়ান : একটা কথা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি যে, “Happiness is not a destination, it’s a journey.” কিন্তু কেন happiness is a continuous journey তা সবসময় গভীরভাবে হয়তো ভেবে দেখা হয় না। চলুন বিষয়টা নিয়ে সামান্য আলাপ করা যাক।
পৃথিবীতে এমন একজন মানুষও বোধহয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে যে সুখী হতে চায় না। আমরা সবাই সুখী হতে চাই। নতুন ফোন, ভালো রেজাল্ট, প্রমোশন, আরো কত কি। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনো আনন্দই যেন খুব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় না। কিছুদিন পর আমরা আবার যেন আগের মতোই শূন্যতা বা অপূর্ণতা অনুভব করি। এই ঘটনাটাকেই মনোবৈজ্ঞানিক টার্মে বলা হয় “হেডোনিক ট্রেডমিল”।
হেডোনিক ট্রেডমিল বোঝায় যে মানুষ সুখকর বা দুঃখজনক পরিবর্তনের পরেও ধীরে ধীরে আবার তার “baseline happiness” বা স্বাভাবিক সুখের স্তরে ফিরে আসে।
হেডোনিক ট্রেডমিল দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হওয়া একটি মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা। এই ধারণাটিকে জনপ্রিয় ও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেন দু’জন মনোবিজ্ঞানী: Philip Brickman এবং Donald T. Campbell. “Hedonic Relativism and Planning the Good Society” নামে একটি প্রবন্ধে ১৯৭১ সালে তাঁরা এই ধারণা তুলে ধরেন।
তাদের গবেষণায় দেখানো হয়—মানুষ বড় সুখ বা দুঃখের ঘটনার পরেও ধীরে ধীরে আবার তার স্বাভাবিক সুখের স্তরে ফিরে আসে।
ধরুন, আপনি অনেকদিন ধরে একটি নতুন মোবাইল ফোন কেনার স্বপ্ন দেখছিলেন। অবশেষে সেটি কিনলেন। প্রথম কয়েকদিন সেটি আপনাকে ভীষণ আনন্দ দেবে। কিন্তু কিছুদিন পর সেটি আপনার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন হয়তো আরও নতুন বা উন্নত কিছু চাওয়ার ইচ্ছা জন্মাবে। এই চক্র চলতেই থাকে। বিষয়টি ঠিক ট্রেডমিলে দৌড়ানোর মতোই।
১৯৭৮ সালে প্রকাশিত Brickman, Coates & Janoff-Bulman এর গবেষণায় একই বিষয় আলোচিত হয়। এই গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের মানুষকে তুলনা করা হয়। যেমন লটারি জেতা মানুষ, গুরুতর দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া মানুষ সাধারণ মানুষ ইত্যাদি।
তাদেরকে সুখ সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। যেমন- বর্তমানে তারা কতটা সুখী? ভবিষ্যতে কতটা সুখী হবে বলে মনে করে? প্রতিদিনের ছোট ছোট আনন্দ থেকে কতটা সুখ পায়? উত্তরে প্রত্যেক গ্রুপের আলাদা আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
লটারি বিজয়ীরা বলে, প্রথমে তারা খুব খুশি হয়, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে তাদের সুখের স্তর ধীরে ধীরে আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে আসে। বরং গবেষণায় দেখা যায়, পরবর্তীতে তারা দৈনন্দিন ছোট আনন্দগুলোকে তুলনামূলক কম উপভোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল।
দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া মানুষজন জানায়, প্রাথমিকভাবে তারা খুব মনোঃকষ্টে ভোগে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তারা মানসিকভাবে অ্যাডজাস্ট করে নেয়। তাদের সুখের স্তর অনেকটা আগের মতো হয়ে যায় (যদিও কিছু পার্থক্য থাকে)।
এই ঘটনাকে বলা হয় hedonic adaptation. মানুষ আসলে একটা সময় পর নতুন পরিস্থিতির সাথে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। বড় সুখ বা বড় দুঃখ, দুটোই সময়ের সাথে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে আমরা সবসময় আবার নতুন কিছু চাই। মনোবিজ্ঞানের কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল সুখের স্তর বা set-point থাকে, যেখানে সে সময়ের সাথে আবার ফিরে যেতে প্রবণ হয়। এই “set-point” কে আগে স্থির মনে করা হতো। তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, এটা পুরোপুরি স্থির নয় বরং আংশিক স্থির। ডিভোর্স, পরিবারের বা কাছের কারো মৃত্যু, চাইল্ডহুড ট্রমা বা অন্য কোনো গভীর ও আকস্মিক ঘটনা মানুষের set point পরিবর্তন করতে পারে।
মানুষের জাগতিক চাহিদার শেষ কোথায়? বিষয়টি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলেও উঠে আসে চমকপ্রদ তথ্য।
হেডোনিক ট্রেডমিল ধারণার সাথে ইসলামি শিক্ষার গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষের অন্তহীন চাহিদা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) আজ থেকে হাজার বছর আগে বলে গেছেন:
“যদি আদম সন্তানের জন্য সোনা-ভর্তি একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে আরেকটি উপত্যকা কামনা করবে… আর তার মুখ মাটি (কবর) ছাড়া আর কিছুতেই পূর্ণ হবে না।”
— সহীহ আল বুখারী
এই হাদিসটি মানুষের চাহিদার অসীম প্রকৃতিকে আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। যা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের হেডোনিক ট্রেডমিল ধারণার সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
এছাড়া পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-
“তোমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা।”
— সুরাহ তাকাফুর (১০২:১)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা আর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আমরা প্রায়ই আসল শান্তি ও সন্তুষ্টি হারিয়ে ফেলি।
তাহলে উপায় কী?
মনস্তাত্ত্বিকভাবে হেডোনিক ট্রেডমিল থেকে পুরোপুরি বের হওয়া হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু এর প্রভাব কমানো সম্ভব। সেজন্য প্রথম ধাপ হলো এ বিষয়ে সচেতন হওয়া যে সুখের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই, সুখ কোনো গন্তব্য নয় যে যেখানে পৌঁছালেই চিরকালের জন্য সবকিছু আনন্দময় লাগবে। এছাড়াও বেশকিছু বিষয় নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আমরা মানসিকভাবে আরও প্রশান্ত ও সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করতে পারি। কৃতজ্ঞতা চর্চা করা, বস্তুগত জিনিসের বিপরীতে অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা, সম্পর্ক ও মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নিজের বর্তমান অবস্থাকে স্বীকার করে তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং অভিযোগ না করে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করা ইত্যাদি।
সবশেষে বলা যায়, সুখ কোনো গন্তব্য নয় এটি একটি চলমান অভিজ্ঞতা। আমরা যত বেশি “আরও চাই” এর পেছনে ছুটবো, ততই এই ট্রেডমিলে আটকে যাবো। কিন্তু যদি থেমে বর্তমান মুহূর্তকে অনুভব করতে শিখি, তখনই হয়তো সত্যিকারের প্রশান্তির দেখা মিলবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।





















