আইন কলমের কালি নয়, আস্থার দেয়াল

শেখ সুলতানা মীম : সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার প্রতিটি স্তম্ভ আইনের উপর নির্ভরশীল। যেকোনো কিছুর ভালো-মন্দের মাপকাঠি নির্ধারিত হয় আইনের মাধ্যমে। কিন্তু যখন আইন শুধু কলমের কালি হয়ে কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের মনে গড়ে ওঠা আস্থার দেয়াল ধসে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় অরাজকতা। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিকভাবে পুরো জাতির উপর।

শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে। শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো ও তাদের উপর অমানবিক আচরণ এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একাধিক আইন ও বিধান রয়েছে। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে শিশুদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৪ নং অনুচ্ছেদে শোষণ ও শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করার কঠোর বিধান রয়েছে। আবার ১৭ নং অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক শিক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে আইনের কার্যকারিতা অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ অতীতের তুলনায় বর্তমানে দুর্নীতি, অশ্লীলতা, অনৈতিকতা, চুরি, ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, ইভটিজিং ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব আইন অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ; বাস্তবে এর যথাযথ প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন কলকারখানায় এখনও শিশুশ্রম চলছে। কোথাও কোথাও শিশু অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে, যা শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শিশু শিক্ষা। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় এমন অনেক শিশুকে দেখা যায়, যারা স্কুলে যাওয়ার বয়সে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ আবার মাদক ও অপরাধের দিকেও ঝুঁকে পড়ছে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিশু নির্যাতনের ঘটনা পুরো সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

যেখানে তাদেরকে ভালো খারাপ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঠানো সেই প্রতিষ্ঠানই তাদেরকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু শিশুরাই নয়, নারীরাও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি নিজেদের ঘরেও তারা শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছেন। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে নারী নিরাপত্তার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২৮(১) অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে এবং ১৯(২) অনুচ্ছেদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বৈষম্যের সেই দেয়াল আজও ভাঙেনি। অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে কিছু অসাধু চক্র নিরীহ মানুষের উপর হামলে পড়ে। টাকা-পয়সা লুট করার পাশাপাশি অনেক সময় কেড়ে নেওয়া হয় নিরপরাধ মানুষের জীবনও। তবে এসব অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। ফলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। প্রশাসনের দুর্বল তদারকির কারণে বাজার পরিস্থিতি দিন দিন অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। শুধু বাজার ব্যবস্থাই নয়, চাকরির পরীক্ষাগুলোতেও অনৈতিক কার্যক্রম দেখা যায়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি পরীক্ষায় প্রতারণা করে মেধাবীদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।

অথচ অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে একটি সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখে, যেন তারা নিজেদের পরিবারকে স্বচ্ছলতা দিতে পারে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে তারা অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়ে এবং ভেঙে যায় তাদের আত্মবিশ্বাস। এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের উপর। দেশে এসব অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও অপরাধ কমছে না; বরং দিন দিন বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো—আইন আছে, কিন্তু তার কঠোর বাস্তবায়ন নেই। অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা সাময়িক শাস্তি পেলেও অর্থ ও ক্ষমতার জোরে আবার সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ফলে তারা পুনরায় একই অপরাধ করার সুযোগ পায়। একজন অপরাধীর অপকর্ম শুধু একজন ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং তার পরিবার, সমাজ এবং পুরো রাষ্ট্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জনগণ রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলে এবং রাষ্ট্রের কাঠামো ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ধীরে ধীরে মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে। যার ফলে সমাজের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়ে যা সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নতিকেও বাধাগ্রস্ত করে। কারণ মানুষ আইনকে আশ্রয় করে নিরাপদ ও সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকলে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। যা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের জন্য কখনোই কাম্য নয়।

রাষ্ট্রের উচিত আইনকে শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে তার কঠোর ও ন্যায়সঙ্গত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কারখানায় শিশু নির্যাতন হবে সেগুলো আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর শাস্তি আরোপ করা। সেই সাথে যেসকল ব্যাক্তিবর্গ অন্যায়-অবিচার করবে, অন্যদের হয়রানির মুখে ফেলবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা।অন্যথায় দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণ রাষ্ট্রের উপর থেকে তাদের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। পরিশেষে বলা যায় আইন কোনো রাষ্ট্রের জন্য শুধু লিখিত কিছু বিধান নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার, ন্যায়বিচার ও আস্থার প্রতীক।

যখন আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হয়, তখন সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু আইন যদি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অপরাধ, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং জনগণ সবাইকে সম্মিলিতভাবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, আইনকে মান্য করতে হবে এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ এবং একই সাথে দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *