শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চিতায়নে সংকট

আফরিদা ইসলাম : বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি জাতির ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় কারণ এই স্তরেই শিশুদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানসিক বিকাশের সূচনা ঘটে কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গাফিলতি এই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে যা ভবিষ্যতের জন্য ব্যাধি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ্য করা যায় কিছু শিক্ষক নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেন না, দেরিতে বিদ্যালয়ে আসেন বা নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান, ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। এছাড়া অনেক শিক্ষক যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া পাঠদান করেন যার ফলে পাঠগুলো একঘেয়ে ও অপ্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং ছোট শিশুদের মধ্যে শেখার আগ্রহ কমে যায়।যদিও এই বয়সে শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগের অভাব একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় কারণ প্রতিটি শিশুর শেখার ক্ষমতা ও গতি আলাদা হলেও অনেক শিক্ষক দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সহায়তা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না ফলে তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এর পাশাপাশি দায়িত্ববোধ ও পেশাগত নৈতিকতার ঘাটতিও গাফিলতির অন্যতম কারণ কারণ শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয় বরং এটি একটি মহান দায়িত্ব যেখানে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি তার চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কিন্তু যখন এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয় না তখন তার নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থী ও সমাজ উভয়ের ওপরই পড়ে।

শতভাগ ভর্তির হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়া এবং প্রাথমিক স্তর শেষ করার আগেই প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের ঝরে পড়া। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও মানসম্মত শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। 

অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার কতৃর্ক বিভিন্ন বাজেট শিক্ষক রা আত্নসাথ করছে। এখানে আরেকটি বিষয় না তুললেই নয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের আত্মীয় সজন কে দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন পদে বহাল করছে। তাছাড়া বিদ্যালয়ের পরিবেশ অক্ষুন্য না রেখে বাসা বাড়ির মত বিদ্যালয়কে ব্যবহার করছে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের যথাযথ পরিবেশ অনুভব করছে না।এর কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে যেমন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সীমিত বেতন কাঠামো এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপ যা অনেক সময় শিক্ষকদের মধ্যে অনীহা বা উদাসীনতা সৃষ্টি করে ফলে তারা নিজেদের দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হন।

তাই এই সমস্যার সমাধানে শুধু শিক্ষকদের সমালোচনা করলেই চলবে না, বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ও আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা, এবং উৎসাহমূলক প্রণোদনা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।পাশাপাশি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসবের কারনে অভিভাবক রা এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেলেছে টাকার সংকট থাকলেও কেউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চায় না তারা ছুটে যায় বেসরকারি বিদ্যালয়ে। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এত এত দক্ষ শিক্ষিত দের নিয়োগ করে লাভ কি হচ্ছে। সর্বোপরি, প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষকদের দায়িত্বশীল, আন্তরিক ও সচেতন ভূমিকা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক, নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠবে, যা জাতির অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করবে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *