দেশের উন্নয়নে শ্রমশক্তির গুরুত্ব

মো. জাহিদ হাসান : একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে মূল ভূমিকা রাখে সেই দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। আর অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে বেগবান করে তুলতে শ্রমশক্তির বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যুগে যুগে শ্রমিকরা মালিক শ্রেণির কাছে নানাভাবে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। বর্তমানও সেই ধারা অনেকটাই অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিক শোষণের এই অপসংস্কৃতির কারণে মালিক শ্রেণি লাভবান হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।

অবকাঠামোগত কার্যক্রম থেকে শুরু করে উৎপাদনশীল সকল কাজে শ্রমিকের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকে। শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদিত হয়, বস্ত্র তৈরি হয়, অবকাঠামো নির্মাণ হয়, যানবাহন চলাচল করে, মালামালে সরবরাহ হয় ইত্যাদি। অথচ, সামাজিক অমর্যাদার অভাবে শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত মার খায়। শ্রমিকের প্রতি সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষের বঞ্চনা ও নিরুৎসাহ শ্রম শক্তিকে দমিয়ে রাখে। উন্নত দেশের শিক্ষিত যুবকরা যেখানে কৃষি, কারখানা সহ সকল শ্রম ক্ষেত্রে দক্ষভাবে অত্যন্ত গর্বের সাথে কাজ করছে, সেখানে আমাদের দেশের যুবকরা সরকারি চাকরির পেছনে ছুটে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক অমর্যাদা-ই শ্রমশক্তিতে যুবকদের অংশগ্রহণে প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

বাংলাদেশে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে একজন শ্রমিক তাঁর মালিক শ্রেণির কাছে লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। বিশেষ করে, গার্মেন্টস কারখানায় নারী শ্রমিকরা ব্যাপকভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, অধিকাংশ নারী শ্রমিক তাঁর স্বামীর কাছে নির্যাতনের শিকার হয়।

শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। আইসিডিডিআরবি’র নিজস্ব কার্যালয়ে এক গবেষণা অনুযায়ী, নারী পোশাক শ্রমিকদের ৪৩ শতাংশ স্বামীর নির্যাতনের শিকার এবং এদের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিষন্নতায় আক্রান্ত। কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশে শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা বেতন সংক্রান্ত। বিভিন্ন অজুহাতে শ্রমিকদের বেতন কাটা হয় এবং বেতন আঁটকে দেওয়া হয়। শ্রমিকদের শুধু সস্তা শ্রম হিসেবে নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

সঠিক কর্ম পরিবেশের অভাবে প্রতিবছর দূর্ঘটনায় আমাদের দেশের অনেক শ্রমিক মারা যান। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে মোট ৩৩৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। অধিকাংশ শ্রমিকরা শর্ত অনুযায়ী নিয়োগ সংক্রান্ত সুবিধা পান না। মালিকদের অপকৌশলের কারণে অনেক শ্রমিক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হয়।

অনেক কারখানায় কর্মবিরতি দেওয়া হয় না, সক্ষমতা না থাকলেও বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের একটানা কাজ করতে হয়। অনেকেই পান না সাপ্তাহিক ছুটি। নারী শ্রমিকদের অনেকেই মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। শর্তে উল্লেখ থাকলেও অনেক সময় শ্রমিকদের বোনাস দেওয়া হয় না। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, বড় পোশাক কারখানা ছাড়া অন্যান্য শ্রম ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য এধরণের বিশেষ সুবিধা একেবারেই নেই।

শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য বেতন সংক্রান্ত। অধিকাংশ শ্রমিক সময়মতো বেতন পান না। অনেক সময় নানা অজুহাতে তাঁদের বেতন কাটা হয়, কিংবা কয়েক মাসের বেতন একেবারে আঁটকে দেওয়া হয়। এর ফলে শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে মানসিক অশান্তিতে পড়তে হয়। ঢাকা শহরে প্রায়ই শ্রমিকদের আন্দোলন করতে দেখা যায়, কিন্তু কোনো সুরাহা মেলে না; বরং এতে কারখানা বন্ধ হয়ে মালিক ও শ্রমিক উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়ে। উপর্যুপরি দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন দেওয়া হয় না। দরিদ্র শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের অভাবে অন্যায্য বেতনেই কাজ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে পরোক্ষভাবে শ্রমশক্তির ক্ষয় হয়। শিশুশ্রম এখন অহরহ দেখা যায়। শ্রমের এ অপব্যবহার দেশের জনশক্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শ্রমশক্তি উন্নয়নের লক্ষ্যে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরকার কার্যকরী শ্রম পরিকল্পনা। সরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশের অনেক শ্রমিক দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার পথে প্রায়ই মারা যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ভূমধ্যসাগরে ৫৫৯ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভাসমান নৌকায় থাকা কমপক্ষে ২২ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি। অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার উপক্রম কমাতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এখন বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের নজর দেওয়া দরকার।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ শ্রমিক বিপর্যস্ত জীবনযাপন করে। পুষ্টি ও সুচিকিৎসার অভাবে শ্রমিকরা অল্পতেই শারীরিকভাবে ঝড়ে পড়ে। শ্রমশক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রান্তিক অঞ্চলের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারিভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশের চা বাগানের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন বৈষম্যের শিকার আসছে। কিন্তু, তাঁদের ন্যায্য অধিকার রক্ষার্থে এবং জীবনমান উন্নয়নে এখনো কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এটা মোটেই কাম্য নয়। সরকারি তদারকিতে দেশের যেকোনো কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষার্থে নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। নারী শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য দূর করতে হবে। নারী ও পুরুষের সমান শ্রম ও উৎপাদনের ভিত্তিতে বেতনের ক্ষেত্রে সাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশেষ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ করতে এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষার্থে সরকার কর্তৃক শ্রম আইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু, এ আইনের খুবই দূর্বল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ শ্রমিক অশিক্ষিত ও দরিদ্র হওয়ায় শ্রম আইনের ব্যাপারে তাঁরা জানেন না, কিংবা জানলেও কাজ হারানোর ভয়ে আইনের সহায়তা নিতে চান না। শ্রম আইনের উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে এ সম্পর্কে সচেতন বৃদ্ধি করতে হবে এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ হতে হবে। শ্রমিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। অনেক শ্রমিক আছে, যারা কাজে ফাঁকি দেয়। বিশেষ করে সরকারি কাজের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ব্যাপক উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে সরকারি কাজে তদারকি জোরদার করতে হবে।

সর্বোপরি, শ্রমিকরা দেশের সম্পদ। শ্রমিকরা ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকবো, দেশ ভালো থাকবে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষার্থে এবং মর্যাদার সাথে কাজের সুযোগ সৃষ্টিতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *