ইতিহাসের আঙিনায় একদিন : মিয়ার দালানে লীস পরিবার

আশিকুর রহমান : ​সুন্দর স্নিগ্ধ একটি অপূর্ব প্রভাত। আকাশটা রৌদ্রময়। চারদিকে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ। বৈশাখের প্রবাহিত শিহরিত মিষ্টি বাতাস। এই নৈসর্গিক পরিবেশে লীস পরিবার বাসের জন্য ক্যাম্পাসের মেইন গেইটে অপেক্ষমাণ। ভ্রমণের নির্ধারিত স্থান বিখ্যাত মিয়ার দালান। তবে বাসগুলো যেন ইদানীং করে অনেক লেট। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও বাসের দেখা পাওয়া ভার। জ্বালানি সংকট হয়তো অন্যতম কারণ। তাই অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে। তাই বসে আছি। চা পান করছি। তবে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। প্রতীক্ষার প্রহর ভেঙে অবশেষে এলো ক্যাম্পাসের গাঢ় লাল বাস।

একরাশ উল্লাস এবং প্রত্যাশা নিয়ে বসলাম সিটে। জানালার একদম পাশে। সাথে ছিল বন্ধু জুবায়ের। বাকি সবাই সুবিধাজনক জায়গায় বসে আছে। ছুটির দিন বিধায় বাসটা ক্যাম্পাসের চারদিকে একবার ঘুরে আসবে। তবে মন্দ নয়। এরকম ভ্রমণের শুরুতে যদি ক্যাম্পাসটা একবার দেখা হয়ে যায়, তাহলে খারাপ কী! তবে চুপচাপ বসে আছি। উপভোগ করছি চারদিকের প্রাকৃতিক পরিবেশ। চিরচেনা ক্যাম্পাস। তবে তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। নির্ধারিত বাসটি ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। প্রাথমিকভাবে গন্তব্য আরাপপুর বাসস্ট্যান্ড। দূরত্ব বেশি নয়, মাত্র ২২ কিলোমিটার। রাস্তা ভালো। তাই সময়ও বেশি একটা লাগার কথা না। যা সময় লেগেছিল তা ছিল অত্যন্ত মনোরম, আরামদায়ক। রাস্তার দুই ধারে বড় বড় গাছের লম্বা সারি। বিভিন্ন ফলের বাগান। আরো ছিল দৃষ্টিনন্দন বাণিজ্যিক সূর্যমুখী ফুলের বাগান। হরেক রকম ফসলের ক্ষেত। মাঠে কৃষকের ব্যস্ত সময়। কিন্তু তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন। বাইক, বাস এবং ট্রাকগুলো মূর্তিমান মূর্তির মতো স্থির। চাতকের ন্যায় জ্বালানি পাওয়ার অপেক্ষায়। তবে যার শুরু আছে, তার শেষ তো থাকবেই। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। সময়ের শেষ প্রান্তে আমরা পৌঁছালাম নির্ধারিত প্রাথমিক গন্তব্যে।

ঝিনাইদহ শহরের প্রাণকেন্দ্র আরাপপুরে। তবে চূড়ান্ত গন্তব্য বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপত্য মিয়ার দালান। এখনো অনেকটা পথ বাকি। প্রচণ্ড গরমে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব নয়। আমরা ছিলাম ১২ জন। তাই অনেক খোঁজাখুঁজির পর দুটো ইজিবাইক নিতে হলো। গ্রামের অপূর্ব রাস্তায় অবিরাম ছুটে চলল ইজিবাইক। অভিজ্ঞতার ঝুলিটাও মন্দ না। সবাই অনেক উপভোগ করছিল। সমানে চলছিল গল্প-গুজব। অবশেষে আমরা পৌঁছালাম নির্ধারিত গন্তব্যে। মিয়ার দালানের আঙিনায়। ভবনটির নকশা যেন মন কেড়ে নেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের ঐতিহ্যবাহী নকশাকারদের দক্ষতাকে, যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তপ্রায়। ঐতিহাসিক তথ্য মতে, ভবনটি তৈরিতে মোট খরচ হয় তৎকালীন ৭৫ হাজার টাকা। রাজচন্দ্র রাজ নামক মিস্ত্রি নদীর মাঝখানে ভবনটি বানিয়েছেন। নির্মাণ করেছেন আপন হাতে, নিজ মহিমায়, আপন দক্ষতায়। কথিত আছে, মালিক সেলিম চৌধুরী ভবনটিকে পদ্মার সাথে তুলনা করেছেন। তবে তার বংশধর এখন এটার মালিক নয়। অনেক হাতবদল হয়েছে। যদিও সময়ের পরিক্রমায় এটির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। সেই নদী আজ মৃতপ্রায়। ভবনটিও হারিয়েছে জৌলুস, চাকচিক্য। অধিকাংশ জায়গায় ভগ্নপ্রায়। কিছু জায়গায় মেরামত করে বাসযোগ্য করা হয়েছে। তবে বড় কোনো ভূমিকম্প আসলে তা টিকে থাকবে কিনা, সেটা আলোচনার দাবি রাখে।

প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের উচিত, এটি সরকারি মালিকানায় নিয়ে সংরক্ষণ এবং মেরামত করা। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। যদিও ছোট মুখে বড় কথা, তবে এটা যে বেঠিক নয়, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যাইহোক, আমরা প্রতিটি স্থান পর্যবেক্ষণ করলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম প্রতিটি কারুকার্য। যা আর্ট সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। সম্মোহিত করেছে আমাদের। এভাবেই কেটে গেল অনেকটা সময়। তবে সূর্যের উত্তাপ যেন থেমে নেই।

অবিরাম আপন কাজ করে যাচ্ছে। তাই অনেকটা ক্লান্ত হয়েই একটা জায়গায় বসলাম। কিন্তু উত্তরে প্রবাহিত হচ্ছিল বাতাস। চারদিকে ধানক্ষেত। খেজুর গাছ। তালগাছের সমাহার। আড্ডা, গল্প-গুজবে সবাই মাতলাম। দিনটিকে স্মরণীয় রাখার জন্য তোলা হলো কিছু স্থিরচিত্র। এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, মনোরম পরিবেশে দেশ-জাতির কল্যাণে সংগঠনের করণীয় আলোচনাও হয়। যদিও অনেক প্রতিবন্ধকতা, বাধা-বিপত্তি আছে, কিন্তু আমরা সবাই আশাবাদী। সবাই যেন আইনের আলোয় আলোকিত হয়, সেটাই সকলের প্রত্যাশা। যদি দেশের মানুষদের জন্য কিছু করতে পারি, তাহলে আমরা দিনশেষে সার্থক। যাইহোক, সময়ের তাগিদে শুরু হলো ফিরে আসার উদ্যোগ। বিদায় জানালাম অপূর্ব ঐতিহাসিক ভবনটিকে। শুধু বিদায়বেলায় নিয়ে আসলাম একটুকরো স্মৃতি। যা আমাদের ভাবিত করবে ভবিষ্যতে। মনস্তাত্ত্বিক জগতে তাগিদ দেবে নিজ কর্মসাধনে। স্মরণ করিয়ে দেবে আবহমান বাংলার জীবন এবং ইতিহাসকে। সূর্য যেমন অস্ত যায়, তেমনিভাবে এক দিনের স্বপ্নযাত্রার ঘটল সমাপ্তি। যা ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।

লেখক : শিক্ষার্থী, আল-ফিকহ্ এন্ড ল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *