আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস : সরকারের কাছে প্রত্যাশা

মোজাহিদ হোসেন : আজকের মানবসভ্যতা একদিনে গড়ে উঠেনি। কালের ধারাবাহিকতায় এবং শ্রমজীবী মানুষের পরিশ্রমেই আজকের সভ্যতা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো এই শ্রমজীবীদের মানবসভ্যতা তৈরিতে এতো অবদান থাকা সত্ত্বেও সেই অনুযায়ী মূল্য দেওয়া হয়না। কোনো কালেই তারা যথার্থ মূল্য পায় না। সেটা সমাজে হোক, দেশে হোক বা বিশ্বে। যাদের শ্রমেই গড়া এ বিশ্ব, সেই বিশ্বে তারাই মূল্যহীন।

প্রতি বছর মে দিবস আসে, যায়। মে দিবস উৎযাপন হয়। সভায় সরকার থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সবাই শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অনেক আলোচনা করেন, আশ্বাস প্রদান করেন, কিন্তু বাস্তবায়নের দিকে ফলাফল শূন্য। শ্রমিকদের সুবিধা অসুবিধা সবাই বুঝে । কিন্তু শ্রমিকদের অতীতে যেরকম অবস্থা, বর্তমানেও একই রকম অবস্থা? ভবিষ্যতে এর পরিবর্তন হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাহলে কি শ্রমিকদের ভাগ্য বদলাবে না?
দেশের সরকার পরিবর্তন হয়, এমপি মন্ত্রী পরিবর্তন হয় কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্য বদলায় না। আদৌও কি পরিবর্তন হবে!

আমাদের বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষিই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্রামে বসবাসরত সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। গ্রামের এই কৃষকেরা শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। কিন্তু ফলাফল হিসেবে তারা দেশ থেকে কি পায়? ধান বা অন্যান্য ফসল তোলার পর কৃষকের মুলধন পাওয়াই কষ্টকর হয়ে যায়। ফসল উৎপাদনে জমি তৈরি, বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রম, সেচসহ অনেক খরচ। আবার অতিবৃষ্টির প্রভাবে অনেক সময় ফসল নষ্ট হয়ে যায়। অনাবৃষ্টির প্রভাবেও ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকের লোকসান বাড়তে থাকে। এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। যা লোকসান পুরোটাই কৃষকের। আবার ফসল তোলার পর বিক্রির সময় দেখা যায় সিন্ডিকেটের প্রভাবে ফসলের দাম তুলনামূলক অনেক কম। এ ক্ষেত্রেও সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। কৃষকের শুধু লোকসানেই । অথচ কৃষকের ফলানো চাষেই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। কৃষকের নানাবিধ সমস্যায় সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

শ্রমের ন্যায্য মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং একটি শোষণমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ১’মে মহান মে দিবসকে সামনে রেখে প্রতি বছরই এই বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে আট ঘণ্টা শ্রমের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের শুধু সস্তা শ্রম হিসেবে নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে হবে যা তাদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দর শক্তিশালী শ্রম বাজার হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

শ্রমিকদের প্রত্যাশা

পুঁজিপতি রাষ্ট্রে শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণ করে কলকারখানার মালিকেরাই। সাধারণ ভাবে বেতন নির্ধারন করা হয়, সময়ের প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু বাস্তবতায় কি তাই হয়? একজন মানুষের থাকা খাওয়া এবং পরিবারের ভরণপোষণ পূরণের জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা কি আদৌও তারা পায়! সে জায়গা থেকে সরকারের উচিত শ্রমিকের যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া।
আবার নারী পুরুষের মধ্যে পারিশ্রমিক বা বেতনের ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়।
আজকের মানবসভ্যতা তৈরিতে নারী পুরুষের সমান অবদান। পুরুষ কখনো একক ভাবে কোনো কিছু করতে পারেনি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে নারীরও অংশগ্রহণ ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যানকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমাদের দেশে পুরুষ ও নারী শ্রমিকের মধ্যে পারিশ্রমিক কমবেশি করা হয়। এটি একটি বৈষম্য। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। এই বৈষম্য গ্রাম থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত। পুরুষের তুলনায় নারীকে কম মজুরি বা বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু কেন? একজন পুরুষ তার সক্ষমতার জায়গা থেকে কাজ করে, একজন নারীও তাই করে। একজন পুরুষ যেমন তার সক্ষমতার বাইরে কিছু করতে পারবে না। ঠিক তেমনি একজন নারীও তার সক্ষমতার বেশি কিছু করতে পারবে না। তাসত্ত্বেও পারিশ্রমিক দেওয়ার সময় নারী-পুরুষের বৈষম্য। এটা কখনোই কাম্য নয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় একজন পুরুষই বেশি কাজ করতে পারে, তাই মজুরি বা বেতন বেশি। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে, পরিবার, সংসার সামলানো থেকে শুরু করে বাইরের কাজ সামগ্রিক ভাবে একজন নারী কখনো কম কাজ করে না। তারপরও সমাজে এই বৈষম্য। এই বৈষম্য দূর করা সময়ের দাবি। এছাড়া কর্মক্ষেরে নারীদের হেয় করা হয়। খারাপ আচরণ করা হয়। যা রীতিমতো অন্যায় ও আইন বিরুদ্ধ। এসব বিষয়ে সরকারের উচিত দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটা জায়গা পোশাক শিল্প। লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত। সকালে যাত্রা শুরু হয়, শেষ হয় সন্ধ্যায়। কিন্তু বেতনের ক্ষেত্রে খুবই স্বল্প। শ্রমিকদের জীবন কোনো রকম অতিবাহিত হয়।
এছাড়া দেশের চা শ্রমিকরা বরাবরই বৈষম্যের শিকার হয়। মাঝে মাঝে বেতন বৃদ্ধির জন্য তাদের আন্দোলন দেখা যায়। তারপর আবার শেষ হয়ে যায়।

ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।
এছাড়া দেশে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিক আছে। রাস্তার কাজে, ইট ভাটায়, দিনমজুর, হোটেলে, দোকানসহ বিভিন্ন জায়গায় মানুষ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এসব জায়গায় স্বল্প বেতনে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। আবার শ্রমিকদের সাথে অনেক সময় খারাপ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে আইন প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এসব ক্ষেত্রে শিশুরাই বেশি বৈষম্যের শিকার হয়।
আমাদের দেশে শিশুশ্রম আরেক বড় সমস্যা। বরাবরই শিশুশ্রম বন্ধ করার কথা বলা হয়, কিন্তু বন্ধ হয় না। কখনো নিজের প্রয়োজনে, কখনো পরিবারের প্রয়োজনে, কখনো বা অন্যের চাপে। সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে শিশুশ্রমের ব্যাপারে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এছাড়া গিগ ইকোনমি শ্রমিকদের ব্যাপারেও সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গিগ ইকোনমি বলতে এমন একটি শ্রমবাজারকে বোঝায়, যেখানে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ও নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক বা অনিয়মিত কাজ করে আয় করে। সাধারণ ভাবে এরা কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মচারী নয়। এরা ফ্রিল্যান্সার, পার্টটাইমার, কিংবা রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের ড্রাইভার বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ডেলিভারি পার্সন। বর্তমান বিশ্বে গিগ শ্রমিকদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলছে । বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে গিগ ইকোনমির আওতায় পড়বে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশেও ব্যতিক্রম নয় । পাঠাও, উবার, ফুডপান্ডা, Fiverr, Upwork-এর মতো প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার বাংলাদেশী তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়ে পড়েছেন।

গিগ ইকোনমির বড় বৈশিষ্ট্য হলো কাজের নমনীয়তা। এখানে কর্মীরা নিজের ইচ্ছামতো কাজের সময় নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু এই নমনীয়তার আড়ালে রয়েছে অনিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, স্থায়ী আয় না থাকা এবং শ্রম আইনের বাইরের অবস্থান। তাই এইসব বিষয়ের উপর খেয়াল রেখে সরকার উচিত এই শ্রেণির শ্রমিকদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *