ভাঙ্গন

লেখিকা : মারজিয়া তাবাসসুম

এই পিচ্চি দোকানে খিচুড়ি পাওয়া যাবে?

উত্তপ্ত কড়াইয়ে চিটচিট করে ডিম ভাজতে দিয়ে উত্তর দেয়, না খিচুড়ি পাবিন না এখানে।

আশেপাশে অন্য কোনো দোকানে পাওয়া যাবে?

গামছায় হাত মুছতে মুছতে বলে, না। তয় ব্রিজের উপরে বড় হোটেল আছে দেখেন আছে নাকি। বলেই ভারিক্কি চলনে আটার দলা মথে সাকিব। 

কাস্টমার পুনরায় জিজ্ঞেস করে, তোমার দোকানে আর কি কি আছে?

সাকিব গড়গড় করে বলে; ভাত, সব্জি, আলু ভর্তা, ডিম, রুটি-পরোটা। এখন ভাত শেষ। আর একটু অপেক্ষা করলি পরোটা পাবিন।

হনহন করে কাস্টমার বেরিয়ে পরতে পরতে মহাজন কবুতরের খুপরির মতো দোকানটায় ঢুকে। 

আইজ কত গামলা ভাত পরলো রে? জিগ্যেস করে মহাজন।

রুটি বেলতে বেলতে সাকিব উত্তর দেয়, ওস্তাদ তিন গামলা শেষ হইছে। এখন আবার পরোটা ভাজমু। বড়আম্মারে বলেচি, ভাত চড়াইছে এতক্ষণে।

গফুর মিয়া হাত থেকে মাঝারি সাইজের পাঙ্গাস মাছ, আর একটা ফ্রামের মুরগী সাকিবের হাতে তুলে দেয়। সাকিব আলগোছে বড়আম্মার কাছে দিয়ে আসে দোকানের বাইরে পেছনের জায়গাটায়। মাথার উপর ছাউনি দিয়ে এখানেই রান্না করা হয়। ভেতরে শুধু রুটি বানায় সাকিব।

দশ কি বারো বছর তার। বাপ মরেছে সেই নিধন কালে। শুক্কুর আলী তার বাপ, সে আছিলো একজন জেলে। যমুনার এই ভরাযৌবনের এক রাতে বন্ধু হাজরা বেপারীকে সঙ্গে নিয়ে মাছ মারবার গেছিলো। সেদিন রাতে কি কাল বৈশাখির ঝড়! সকালে হাটের সময় প্রেম যমুনার ঘাটে হাজরার লাশ পাওয়া গেলেও সাকিবের বাপ শুক্কুর আলীর লাশ পাওয়া যায়নি। সেই থেকে যে সাকিবদের সংসারে দূর্গতির নামে। ছোট ছোট ছৈলপৈল নিয়ে মা তানুবিবির সংসার যমুনার ভরাডুবি জলের মতো হাবুডুবু খায়। সাকিবের বড় ভাই সাব্বিরের তখন পনেরো বছর তাকে বগুড়া শহরের সাতমাথায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় বড় হোটেলে। এরপর থেকে সাকিব ও এই গফুর মিয়ার ছোট্ট কবুতর খুপরির মতো দেখতে দোকানে কাজ করে। সারাদিন কাজ করে রাতে এসে খেয়ে দেয়ে রাজ্যের ঘুমে হারিয়ে যায় সে।

সাকিব জীবনের বহু উত্থান পতন দেখেছে এই বয়সেই। শারিয়াকান্দির যমুনা নদীর তীরে জেলে পারায় তার বাপের ভিটে। কতবার যে নদী ভাঙ্গনে সব বিলীন হয়েছে আবার কতবার যে এই অঞ্চলের মানুষ গড়েছে। সাকিব মাঝেমধ্যেই চাচাদের সাথে মাছ মারতে বের হয়।  ডিঙ্গি নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে আসমান দেখে। মনে মনে আসমানের লগে নিজের সুখ দুঃখের কথা কয়।  মায়ের অসুখ বোনের বারোমাসের ব্যারাম ভাই দূরে দূরে থাকে দেখা হয় না বছরান্তে। সাকিবের স্কুলে যাওয়া হয়না দেড় বছর হয়। কত দুঃখ ছোট্ট এই জিবনটাতে। মাঝেমধ্যে শবদেহ পুড়ানোর ধোঁয়া দেখে কত কি ভাবনায় আসে তার, আবার কখনো নতুন চর ভেসে উঠলে মনে আশার আলো দেখে সেখানে ঘর পাতার। নিত্যদিন কত মানুষ আসে যায় জীবনের কি তাল লয় বিহীন ছন্দ সাকিব বুঝে উঠেনা। সাকিব বুঝে আইজ বাজান থাকলে তার দোকানে কাজ করা লাগতনা, সে বগলদাবা করে স্কুলে যেতে পারতো। মায়ের আঁচলে ঢেকে রাখতো তার ছোট্ট মুখ খানা। ভাইয়ের সাথে ডাঙ্গুলি কিংবা কাবাডি খেলতে পারতো। কত কি ভাবনায় আসে ভাবতে ভাবতে আটার দলায় ছোট্ট হাত দিয়ে সমস্ত শক্তি ভর করে মথা দেয়। হাতে সামান্য ব্যাথা লাগতেই আবারও মনে মনে উদয় হয় ইশ আইজ বাজান থাকতো …! 

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *