আন্তর্জাতিক সংস্থার নীরবতায় শক্তিধরদের খেলায় বন্দি বিশ্ব শান্তি

সাবিহা তারান্নুম মিম : সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের উন্মাদনায় মত্ত দুই জাতির ছাড় দেয়ার মানসিকতার অভাব আন্তর্জাতিক অস্থিরতাকে তীব্রতর করছে। অভেদ্য অবিশ্বাসের পর্দায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে সংঘাতে জড়িত দেশ দুটি। এছাড়াও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কার্যকারিতা ও কূটনৈতিক কৌশল রয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ।

অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি তৈরি করেছে এক নিশ্চুপ আশঙ্কার ধোঁয়া। তাই প্রয়োজন এই যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান। যা টেকসই শান্তি নিশ্চয়তা প্রদানের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বিশ্ববাসীর। এমতাবস্থায় বিশ্বের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবতা হলো বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার নৈতিক অবস্থান রয়েছে প্রশ্নের মুখে। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও স্থায়ী সমঝোতার অভাবে দীর্ঘমেয়াদী সংকট থেকে উত্তরণের পথ দিনে দিনে সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। আগ্রাসী মনোভাব, বিতর্কিত অবস্থান, প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন কটাক্ষ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নীরব অবস্থান সমালোচনার শিকার। বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতে সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধ কাঠামো এবং স্বাধীনভাবে ক্ষমতা ব্যবহারে অক্ষমতা ব্যর্থ করে দেয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই সংস্থাগুলো প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যকে। বড় রাষ্ট্র, কূটনৈতিক স্বার্থ কিংবা শক্তি নির্ভর বিশ্ব রাজনীতিতে সদিচ্ছা প্রয়োগের ফলে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ভঙ্গ হচ্ছে।

বিশ্ব শান্তি ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গঠন হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা হলো নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা। সত্যিকার অর্থে সংস্থার বড় প্রতিবন্ধকতা হলো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আইন অমান্য করলেও কোন কিছু করার প্রকৃত ক্ষমতা থাকে না। এক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হলো রাষ্ট্রগুলোর অর্থায়নের উপর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাজেট নির্ভরশীলতা। ফলে নিরপেক্ষতার বিষয়টি থাকে প্রশ্নবিদ্ধ। বর্তমান বিশ্বের মাকড়সার জালের মত বুনন করা হয়েছে জটিল জটিল সব নেটওয়ার্ক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণের কোনো সক্ষমতায় নেই।

আন্তর্জাতিক সংস্থার নীরবতা এবং শক্তিধর দেশগুলোর
ভূ-রাজনীতি ও স্বার্থপরতার খেলায় বিশ্বশান্তি বর্তমানে মারাত্মক হুমকির মুখে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল,রাশিয়া, ফিলিস্তিন (গাজা), ইউক্রেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সংঘাতগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার এখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কৌশলের নিচে চাপা পড়ছে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সংঘাত বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাতে কৌশলী অবস্থানে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে বর্তমান অসহনীয় অস্থিরতা সৃষ্টি। ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে পৃথিবীর ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য বড় জ্বালানি সংকটে পড়েছে বিশ্ব। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রয়েছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। নতুবা এই ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাতে রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে যেতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথে।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত সমস্যা পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয়তা। কেননা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রয়েছে তা যেকোন সময়ে আরও বেগবান হয়ে উঠতে পারে। পর্যায়ক্রমে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকারিতা এবং বিশ্ব জনমতের সমন্বিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে পারে বৈশ্বিক শান্তি। তবে বড় বড় রাষ্ট্রগুলোর সমঝোতাপূর্ণ মানসিকতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে টেকসই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে। যেহুতু সাম্প্রতিক ইরান, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঘাত প্রতিঘাতে পিষ্ট হচ্ছে বিশ্ব নিরাপত্তা। ড্রোন হামলা, মিসাইল আক্রমণ, প্রক্সি যুদ্ধ কিংবা বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক হামলার প্রভাব সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়েছে মানব জীবনে।

তাই শুধুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ কখনোই পর্যাপ্ত নয় এই ত্রিমুখী সংঘাতের দহন নেভাতে। আন্তর্জাতিক তথ্যানুসারে, International Criminal Court এবং International Court of Justice যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি নজরে রেখেছে। তবে তারা প্রত্যক্ষভাবে হস্তক্ষেপ না করলেও নজরে রেখেছে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি। অপরদিকে, Amnesty International এবং Human Rights বেসামরিক হতাহতের অভিযোগের ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রকাশ করছে। কিন্তু এই জটিল পরিস্থিতিতে কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রিতা লক্ষণীয়। বড় বড় শক্তি রাষ্ট্রগুলো স্বার্থের ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয় বরং প্রশ্নবিদ্ধ। কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের ফলে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে সকল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা শুধু নীতিগত বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ।

বহুদিন ধরে চলমান এই বৈশ্বিক উদ্বেগ যাতে পারমাণবিক ইস্যুতে পৌঁছাতে না পারে তার জন্য প্রয়োজন কৌশলগত সমঝোতা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোর কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এই ত্রিশক্তি নির্ভর। এমনকি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কূটনৈতিক চাপ, মানবিক সহায়তা কিংবা আইনি নজরদারি ছাড়া সমাধানের পথে নিজস্ব কোন ক্ষমতা প্রয়োগের অবকাশ নেই। ফলে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংঘাত এড়ানোর আহ্বানের পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা অর্জন গুরুত্বপুর্ন। কার্যত বর্তমানের বিশ্ব অর্থনীতিতে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি উত্তরণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে জোট ভিত্তিক সমঝোতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।

বিশ্বের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণে সক্রিয় হতে হবে। সংঘাতে জড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি নিশ্চয়তা দিবে কাঠামোগত নিরাপত্তা। তাদের বিচক্ষণতার সাথে কার্যকরী পদক্ষেপগুলো এই বিপর্যস্ততা কাটিয়ে উঠে সহমর্মিতার নজির সৃষ্টি করবে। এ সংঘাত বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরাসরি প্রভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ও অর্থনৈতিক চাপ স্থবির করে ফেলছে উন্নয়নের চাকা। সংকটের প্রতিচ্ছবি জ্বালানি স্টেশনের দীর্ঘ সারিকে পেরিয়ে মূল্যবৃদ্ধিতে পৌঁছেছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ফেলেছে বিরূপ প্রভাব। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংঘাতে জড়িয়ে থাকা দেশগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ কূটনৈতিক আলোচনা। যা তৈরি করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের রাস্তা। তবে এতে ভূমিকা রাখে দুপক্ষের নিজস্ব স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে পুরো মানবজাতির শান্তিকে প্রাধান্য দেয়া। অর্থাৎ দেশগুলোর বর্তমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন টেকসই শান্তি চুক্তি।

এই যুদ্ধ সামরিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করছে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যবাদের কৌশলগত দমন ফিরিয়ে আনবে মানবজাতির ওপর সুরক্ষার ছায়া। সহমর্মিতাই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার মূলমন্ত্র। বিশ্বব্যাপী সমঝোতা ও সহমর্মিতাই স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করে। দেশগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান পৃথিবীকে দীর্ঘদিন মানব সভ্যতার বসবাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে টিকিয়ে রাখবে। সফল কূটনীতি নিশ্চিত করতে পারবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, সমাজকর্ম বিভাগ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *