শেখ সুলতানা মীম : বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে এবং এর ব্যাবহার দিন দিন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যোগাযোগ, মিটিং, কেনাকাটা, তথ্য আদান- প্রদান করা,বিভিন্ন শিক্ষামূলক সাইটের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করা,জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ ও প্রসারিত করা,নিজের পরিচিত গড়ে তোলা ছাড়াও খাবার অর্ডারসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সব কার্যক্রমই এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।নিত্য প্রয়োজনীয় সকল কর্মকাণ্ডের জন্য আমরা ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। এক কথায় ইন্টারনেট এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে যার সাহায্য ছাড়া আমরা এই আধুনিক বিশ্বে এক মূহুর্তও কল্পনা করতে পারি না।
ইন্টারনেট যেমন আমাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, তেমনি কিছু বিপদের দ্বারও খুলে দিয়েছে, বিশেষ করে তরুণ সমাজের জন্য।এই সমস্যাটা তখনি হয় যখন এর ব্যাবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করছে ইন্টারনেটে। ইন্টারনেট মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো হলো ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, গুগল, ক্রোম ব্রাউজার, ফেসবুক, টিকটক। এর মধ্যে ফেসবুক সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও আলোচিত একটি মাধ্যম। যদিও ফেসবুকের কিছু ইতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য বিনিময়, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, শিক্ষনীয় বার্তা, বিনোদন।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ তরুণ-তরুণী এর নেতিবাচক দিকেই বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে
।অধিকাংশ ব্যবহারকারী অযথা সময় নষ্ট করছে রিলস, ভিডিও, মিম বা কখনও কখনও অশ্লীল কনটেন্ট দেখার মাধ্যমে।ধীরে ধীরে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং আসক্ত হয়ে পড়ে। এই আসক্তি শুধু সময়ের অপচয়ই নয় বরং মানসিক ও চারিত্রিক অবক্ষয়েরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে অনেকেই ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের চিন্তা-ভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, যা উদ্বেগজনক।এই ভার্চুয়াল জগতে অতিমাত্রায় নিমজ্জিত থাকার ফলে দেখা দিচ্ছে সামাজিক অপরাধের প্রবণতা। ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, চুরি, এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও বাড়ছে। তাছাড়াও ফেসবুকের ছোট ছোট রিলস্ বা ভিডিও দেখে তারা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে যার ফলে তারা বেশিক্ষণ কোনো কিছুতে তাদের মনযোগ ধরে রাখতে পারে না। যার সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে পড়াশোনার উপরে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, সৃজনশীলতা নষ্ট হচ্ছে।
অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে তাদের চোখ বেশিরভাগ সময় ফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকে।যার ফলে ক্রমশ তাদের দৃষ্টি শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও অনেক সময় দেখা যায় তারা বিষন্নতায় ভোগে।যখন তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে অন্যরা তাদের চেয়ে ভালো উন্নতি করছে,তাদের থেকে বেশি এগিয়ে যাচ্ছে,তাদের চেয়েও বেশি মেধাবী আর বিখ্যাত তখন তারা নিজেদের ব্যর্থ মনে করে,নিজেদের উপর তাদের ঘৃণা আর বিরক্তি চলে আসে।যার ধরুন আস্তে আস্তে মানসিকভাবে তৈরি হচ্ছে একাকিত্ব, হতাশা ও হীনমন্যতা।তাছাড়াও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যাবহার স্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।ফেসবুকে ভিডিও দেখা,নিউজ দেখা অথবা বন্ধুবান্ধবদের সাথে কথা বলা,আড্ডা দেওয়ার কারণে অনকেই রাতে দেড়ি করে ঘুমাতে যায় যা স্বাস্থ্য এবং ব্রেইন উভয়ের জন্য অনেক ক্ষতিকর। পরিমিত ঘুম না হলে শরীর সবসময় ক্লান্ত থাকে যার ফলে কোনো কাজে মন বসে না।শরীর ও মন অস্থির হয়ে থাকে।
ইন্টারনেটের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পড়াশোনার সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করলে প্রায় ৫২.৬ শতাংশ মনযোগ নষ্ট হয়ে যায়। আবার অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে প্রায় ২৫.২ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়া মনে থাকে না। প্রায় ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় ভুগছে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ইন্টারনেটের মধ্যে আরও একটি ক্ষতিকর দিক হলো অনলাইন গেইম।
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের গেইম যেমন ফ্রি -ফায়ার, পাবজি ইত্যাদির মাঝে তরুণরা আসক্ত হয়ে পড়ছে।তাছাড়াও আছে অনলাইন ক্যাসিনো যেখানে টাকা পাওয়ার লোভে অনেকেই জরিয়ে যায়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো বর্তমানের তরুণ সমাজের বেশিরভাগই এসব ক্ষতিকর মাধ্যমে আসক্ত। এখনই যদি তরুণ সমাজকে সচেতন না করা যায়, তাহলে এই প্রজন্ম এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটের দিকে ধাবিত হবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও ব্যাহত করবে। তাই তরুণদের উচিত বাস্তব জীবনের দিকে মনোনিবেশ করা। বই পড়া, ছবি আঁকা, লেখালেখি, নানামুখী সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়া। এই সকল কার্যক্রম তাদের মেধা, মনন ও মনোবল গঠনে সহায়তা করবে।তাছাড়াও স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা, ইন্টারনেটের খারাপ দিকগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোও তরুণদের ইন্টারনেটের কালো ছায়া থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে।পরিবার,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র এই চারটি স্তরকে একসাথে কাজ করতে হবে। তবেই ইন্টারনেটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তরুণ সমাজকে দূরে রাখা সম্ভব হবে এবং একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবন উপভোগ করতে পারবে।মনে রাখতে হবে, মুখোশধারী ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে বাস্তব জীবনের উন্মুক্ত পাতা অনেক বেশি রঙিন, বর্ণিল ও প্রেরণাদায়ক।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ)।





















