আজহারুল ইসলাম পিয়াস : হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এবং ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। নির্ধারিত পবিত্র সময়ে, পবিত্র মক্কা নগরীতে সমবেত হয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজেকে তাঁর কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করার এই ইবাদত প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফরজ।
তবে হজের তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গুরুত্ব। এ প্রসঙ্গে মহানবী সাঃ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ আদায় করে এবং তাতে অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকে, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।” বিশেষত ‘হজে মাবরুর’ অর্থাৎ আল্লাহর কাছে কবুল হজ মুসলমানের জীবনে এক অনন্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। হজের প্রকৃত তাৎপর্য, পটভূমি, ‘হজে মাবরুর’ কী, এর লক্ষণ ও গুরুত্ব কী–এসব বিষয় নিয়েই এই লেখায় আলোচনা করা হবে।
হজের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল কিছু নির্দিষ্ট কার্যক্রমের পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের অন্তরে তাকওয়া, ধৈর্য, ত্যাগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণাবলি বিকশিত করে। ইহরামের সেই সাদামাটা পোশাকে ধনী-গরিব, জাতি-গোষ্ঠী ও বর্ণভেদ ভুলে একই কাতারে সমবেত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বমানবতার ঐক্যের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, যা ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করে।
একই সঙ্গে হজ মানুষকে দুনিয়ার ধ্যান-ধারণার আসক্তি থেকে সরে এসে আখিরাতমুখী জীবনের প্রতি সচেতন করে তোলে। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, মিনায় রাত্রিযাপন কিংবা কাবা তাওয়াফ, প্রতিটি অনুষঙ্গই মানুষের মনে জবাবদিহিতা, বিনয় ও আত্মসমালোচনার বোধ জাগ্রত করে। ফলে হজ একজন মুসলমানকে নৈতিক ও আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ হওয়ার এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়।
হজের পটভূমি ইসলামের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত, যার সূত্রপাত হযরত ইবরাহিম আঃ, হযরত হাজেরা আঃ ও হযরত ইসমাঈল আঃ-এর ত্যাগ, ধৈর্য ও নিঃশর্ত আনুগত্যের মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম আঃ তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে অনুর্বর মক্কার প্রান্তরে রেখে আসেন, তাদের জন্য যা ছিল কঠিনতম পরীক্ষার মধ্যে একটি। এই পরিস্থিতিতে হযরত হাজেরা আঃ-এর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে পানির সন্ধানে দৌড়ঝাঁপ এবং পরবর্তীতে শিশু ইসমাঈল আঃ-এর পদাঘাতে জমজম কূপের উদ্ভব ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম আঃ ও হযরত ইসমাঈল আঃ কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণ করেন এবং সমগ্র মানবজাতিকে হজ পালনের আহ্বান জানান। কুরআনের ভাষায়, সেই আহ্বান আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা যেমন– সাঈ, আরাফাতে অবস্থান, মিনায় অবস্থান কুরবানি ইত্যাদি সবই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর প্রতীকী বাস্তবায়ন, যা মুসলমানদের ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সমর্পণের শিক্ষা দেয়; স্মরণ করিয়ে দেয় জাতির পিতা ইবরাহিম আঃ এর পরিবারের চরম পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সাফল্য।
‘হজে মাবরুর’ বলতে এমন হজকে বোঝায়, যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে এবং যার প্রভাব ব্যক্তিজীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ইসলামী স্কলারদের মতে, হজ তখনই ‘মাবরুর’ হয়, যখন তা কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তরিকতা, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
হাদিসে নববীতে হজে মাবরুরের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী সাঃ বলেছেন, “কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই ঘোষণা থেকে সহজেই অনুমেয়, হজে মাবরুর একজন মুসলমানের জন্য কতো বড় প্রাপ্তি।
এক্ষেত্রে হজে মাবরুরের কিছু লক্ষণ উল্লেখ করা যেতে পারে। যার মধ্যে–হজের পর মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা, গুনাহ থেকে দূরে থাকা, অন্যের অধিকার আদায়ে সচেতন হওয়া, নেক আমলের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ, হজ যদি মানুষের চরিত্র ও জীবনে স্থায়ী প্রভাব না ফেলে, তবে সেই হজ ‘মাবরুর’ হওয়ার দাবি খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সুতরাং, হজের মূল লক্ষ্য কেবল একটি ধর্মীয় কর্তব্য সম্পন্ন করা নয়; বরং তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। আর এই লক্ষ্যই হজকে ‘মাবরুর’-এর স্তরে পৌঁছে দেয়।
হজ তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এটি একজন মুসলমানের জীবনে আত্মশুদ্ধি ও নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই ইবাদতের চূড়ান্ত সাফল্য নিহিত রয়েছে ‘হজে মাবরুর’ অর্জনে, যা মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
বর্তমান বাস্তবতায়, হজ পালনের পরও যদি ব্যক্তি জীবনে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন না ঘটে, তবে তার আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা, কবুল হজ মানুষের জীবনকে গুনাহ থেকে দূরে রেখে নেক আমলের দিকে পরিচালিত করে, করে রবের নিকটবর্তী।
অতএব, প্রত্যেক মুসলমানের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু হজ আদায় করা নয়; বরং তা ‘মাবরুর’ পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করা। কেননা, হজে মাবরুরই পারে একজন মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে বদলে দিতে, খুলে দিতে পারে সুমহান জান্নাতের দ্বার।
লেখক : আল কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





















