অদৃশ্য নায়ক : পৃথিবী বাঁচানোর লড়াইয়ে অণুজীব

মেহনাজ মনির অথৈ : পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যে উপাদানগুলো মৌলিক ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে অক্সিজেন অন্যতম। স্থল ভাগের বৃক্ষরাজি অক্সিজেন উৎপন্ন করলেও সিংহভাগ অক্সিজেন উৎপন্ন হয় সমুদ্রের বিভিন্ন অনুজীব থেকে। সমুদ্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাইটোপ্ল্যাংকটন, অনুশৈবাল ও সালোকসংশ্লেষকারী ব্যাকটেরিয়া যা পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি উৎপন্ন করে। এই সামুদ্রিক অনুজীবসমূহ বৈশ্বিক কার্বনচক্র ও বায়ুমণ্ডলীয় ভারসাম্য রক্ষায় মৌলিক অবদান রাখে। অর্থাৎ, মানবসভ্যতার শ্বাস-প্রশ্বাস সরাসরি নির্ভর করছে এক বিশাল কিন্তু অদৃশ্য জৈবসমাজের উপর। অনুজীবের গুরুত্ব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নয় মানবদেহ নিজেও এক জটিল অনুজীব বাস্ততন্ত্র।মানবদেহের অন্ত্র, ত্বক, শ্বাসনালীতে বসবাসকারী ট্রিলিয়ন অনুজীব আমাদের দেহের হজম প্রক্রিয়া, ভিটামিন সংশ্লেষণ এবং রোগপ্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেও অনুজীবের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। উদাহরণস্বরূপ, Elysia chlorotica নামক এক প্রজাতির সমুদ্র শামুক Vaucheria litorea শৈবাল থেকে ক্লেরোপ্লাস্ট গ্রহন করে সূর্যালোক ব্যবহার করে শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম যা প্রাণিজগতে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অভিযোজন,তবুও এটি জীববৈচিত্র্য ও জিনগত বিনিময় সন্পর্কিত গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এছাড়া Pestalotiopsis microspora নামক এক প্রজাতির ছত্রাক পলিউরেথেন ভাঙতে সক্ষম বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের অনুজীবভিত্তিক বয়োরিমিডিয়েশন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর সমাধান দিতে পারে। একইভাবে Aedes aegypti মশার মধ্যে Wolbachia ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটিয়ে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ হ্রাসের প্রচেষ্টা বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে অনুজীবকে কেবল রোগের উৎস হিসেবে নয়,বরং রোগনিয়ন্ত্রণের সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। পুষ্টিচক্রেও অণুজীবের ভূমিকা রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাস মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ ভেঙে নাইট্রোজেন,কার্বন ও ফসফরাস পুনরায় পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়। নাইট্রোজেন স্থিরীকরণকারী ব্যাকটেরিয়া বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য যৌগে রূপান্তর করে,যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক। ফলে অনুজীব ছাড়া বস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়বে।
চোখে না দেখা ক্ষুদ্র প্রাণীরা নীরবে বাঁচিয়ে রাখছে আমাদের পৃথিবী।শৈবাল বাতাসে অক্সিজেন জোগায়,ব্যাকটেরিয়া মৃত পদার্থ পচিয়ে মাটিকে উর্বর করে,আর ফাংগাস প্রকৃতির পুনঃব্যবহার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির অগ্রগতিতে এই অনুজীবরাই আসল নেপথ্য নায়ক। তবে অনুজীবনির্ভর এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর মানবসৃষ্ট চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঘটাচ্ছে। সমুদ্র দূষণ,প্লাস্টিক বর্জ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে। বন উজাড় ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী অণুজীব হ্রাস পাচ্ছে। এসব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অণুজীব সম্পর্কিত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। সমুদ্র ও মাটির বাস্ততন্ত্র সংরক্ষণ যুক্তি সংগত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং অণুজীবভিত্তিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উন্নয়ন এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।অণুজীব পৃথিবীর পরিবেশ,জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাদের ভূমিকা অদৃশ্য হলেও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ভবিষ্যতের উন্ননয়ন কৌশলে অণুজীবকে একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।তাহলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়নের ধারা সুদূরপ্রসারী হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *