মো.আরিফুল ইসলাম : বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি বরাবরই দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এই ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। “শিক্ষা, ঐক্য, প্রগতি”—এই শ্লোগানকে ধারণ করে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমান বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় অনেক নেতারই রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয়েছে এই ছাত্রদলের মাধ্যমে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ মার্চ, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের আগে রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের একটি আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়, যা পরে ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপ নেয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর মেয়াদি সেই কমিটির সময়সীমা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
সম্প্রতি নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি আবারও নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একদিকে যেমন তৈরি হয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা, অন্যদিকে সামনে এসেছে নানা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, নেতৃত্ব হতে হবে আদর্শনিষ্ঠ ও নীতিবান। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠন ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে সক্ষম নেতৃত্বই একটি সংগঠনকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক দক্ষতা অপরিহার্য। মাঠপর্যায়ে সক্রিয়, কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম এবং সংকট মোকাবিলায় দক্ষ নেতৃত্বই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা বিবেচনায় রাখা জরুরি। ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের শিক্ষাঙ্গনের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং তা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করার সক্ষমতা থাকতে হবে। চতুর্থত, ত্যাগ ও পরীক্ষিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং দুঃসময়ে সংগঠনের পাশে থাকা নেতাদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সংগঠনের ঐক্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
নতুন কমিটির কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো সংগঠনকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা। দীর্ঘদিনের বিভক্তি ও নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে পুনর্গঠন এবং কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও তা অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সেশনজট, আবাসন সংকট, শিক্ষার মান ও ক্যাম্পাস নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলে ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পারবে।
ইতিবাচক ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও নতুন নেতৃত্বের অন্যতম দায়িত্ব। সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তি, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে শুধু সংগঠনই নয়, সামগ্রিক ছাত্ররাজনীতির পরিবেশও উন্নত হবে।
তবে প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ। সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। পাশাপাশি ডিজিটাল যুগের নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে আধুনিক চিন্তা, কার্যকর যোগাযোগ এবং উদ্ভাবনী কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থাপন করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ছাত্রদলের নতুন কমিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সঠিক নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে তারা যদি প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয়, তবে সংগঠনটি আবারও ছাত্রসমাজে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।





















