পুরনো পাঠশালায়

মো.শাকিল সরদার সাইফুল্লাহ : দিনটি ছিল সোমবার। সকালে আজ একটু আগেই উঠলাম। পাক-পবিত্র হয়ে নামাজ শেষ করে হাঁটতে বের হলাম। সকালের হাওয়া যেন প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর হাঁটার আনন্দটা সত্যিই অন্যরকম।

এর মাঝেই ফোনে রিং ভেসে এলো। ফোন তুলে দেখি বন্ধু আবু বকর কল দিয়েছে। সে বললো, “চলো আজ ঘুরতে যাই।”
আমি বললাম, “কোথায় যাওয়া যায়?”
সে বললো, “পুরোনো পাঠশালায়।”
যেই কথা সেই কাজ—আমিও রাজি হলাম। আবু বকর দায়িত্ব নিল মারুফ আর রাফিজকে নিয়ে আসার, আর আমি দায়িত্ব নিলাম ইসরাফিল, মনির আর নাইমকে নিয়ে আসার। সবাইকে জানিয়ে দিলাম—আজ আমরা আমাদের পুরোনো প্রতিষ্ঠানে ঘুরতে যাচ্ছি।

সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে প্রায় দশটার দিকে রওনা দিলাম। আমার বাড়ি থেকে গাড়ি পেতে অনেক দূর হাঁটতে হয়। তাছাড়া বৃষ্টির কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে গেছে—পা পিছলে পড়ার ভয়ও ছিল।

হাঁটতে হাঁটতেই ইসরাফিলকে ফোন দিলাম। সে তখনো গভীর ঘুমে। আমার ফোন পেয়ে তাড়াহুড়ো করে উঠলো। ও খুব অলস—বাড়ি বাজারের কাছেই, তবুও সবসময় দেরি করে। কিন্তু কী আর করা, বন্ধু তো!

এদিকে মনির আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। বারবার ফোন দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ইসরাফিল এসে গেল। আমরা একসাথে ভ্যানে করে বাজারে গেলাম। পথে মনিরের সাথে দেখা হলো। দূর থেকেই সে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। কাছে আসতেই আবেগে জড়িয়ে ধরলো।
আমরা তিনজন মিলে সামনে এগোতে থাকলাম। এর মাঝে আবু বকরকে ফোন দিলে সে জানালো, তাদের আসতে আরও ত্রিশ মিনিট দেরি হবে। তাই আমরা নিজেদের মধ্যে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠলাম।

মনির খুব পরিশ্রমী ছেলে। সে টিউশন করে নিজের খরচ চালিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স করছে।
অবশেষে আবু বকর, মারুফ, রাফিজ ও নাইম এসে পৌঁছালো। আমরা সবাই মিলে একটি ভ্যান নিলাম। বসতে একটু কষ্ট হচ্ছিল, তবুও আনন্দে ভরপুর ছিলাম।
ভ্যান থেকে নামতেই সুজন আর আনসারের সাথে দেখা হলো। তারা আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরলো—ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত যেন।
তারপর আমরা আনসার মামার চায়ের দোকানে গেলাম। মামার সাথে কুশল বিনিময় করলাম। তিনি আমাদের দেখে খুব খুশি হলেন এবং আগের মতোই নানা রসিকতা করলেন। আমরা সবাই তার বানানো চা পান করলাম।
এরপর আমরা পুরোনো প্রতিষ্ঠানের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পথে ইংরেজি শিক্ষক ইমাদুল হক স্যারের সাথে দেখা হলো। তিনি আমাদের খোঁজখবর নিলেন এবং দোয়া করলেন।
অবশেষে আমরা মাদরাসার মাঠে পৌঁছালাম। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। মনে হলো যেন পুরোনো স্মৃতিগুলো আবার ফিরে এসেছে।
আবু বকর বললো, “দেখ সাইফুল্লাহ, এই সেই বকুল গাছ! কত বকুল ছিঁড়েছি, কত ফুল জমিয়েছি, কত মালা বানিয়েছি!”
আমরা সবাই ঘাসের ওপর বসে ছিলাম। নাইম বললো, “ওইটা সেই রাস্তা, যেখান দিয়ে আমরা টিফিনে পালাতাম!”

নাইমের কথা শুনে আনসার মুচকি হেসে বললো, “মনে আছে? তুই, আমি, রাফিজ, নাজমুল—সবাই ফুটবল খেলতে পালিয়েছিলাম, আর পরের দিন মোস্তইনবিল্লাহ হুজুর আমাদের জরিমানা করেছিলেন!”
এই কথা শুনে সবাই হেসে উঠলাম।
স্মৃতিবিজড়িত অনেক গল্প চললো। এর মধ্যেই আসরের আজান হলো। আমরা মাদরাসার মসজিদে নামাজ আদায় করলাম।
সেদিনটা আমাদের খুব ভালো কেটেছিল—মনে হলো যেন কিছু সময়ের জন্য অতীতে ফিরে গিয়েছিলাম। স্মৃতির পাতায় যোগ হলো এক অতুলনীয় অ্যালবাম।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *