মফস্বল সাংবাদিকতা ও বাস্তবতা

মোজাহিদ হোসেন : প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানামুখী সমস্যা। স্থানীয় পর্যায়ে ব্রিজ, কালর্ভাট, সেতু নির্মান, রাস্তা ভাঙা, অনিয়ম, দূর্নীতিসহ বিভিন্ন সমস্যার সাথে এসব অঞ্চলের জনগণ মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যেখানে এসব সমস্যা সমাধান হওয়ার কথা সেখানে সমস্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সমাধানের দেখা মিলে না। এর অন্যতম একটা কারণ হলো মফস্বল সাংবাদিকতায় সংকট।

সাধারণ ভাবে মফস্বল সাংবাদিকতা বলতে জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ পর্যায়ের সাংবাদিকতাকে বোঝায়, যেখানে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা তাদের নিজ এলাকার মানুষের দাবি, অধিকার ও সমস্যার কথা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরবে এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন করবে। জাতীয় গণমাধ্যমের দৃষ্টি যেখানে পৌঁছায় না, মফস্বল সাংবাদিকতা সেই শূন্যতা পূরণ করে। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলকে সচল রাখার অন্যতম হাতিয়ার।

স্থানীয় পর্যায়ে মফস্বল সাংবাদিকতার প্রয়োজন অত্যাধিক। কেননা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। গ্রামীণ পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা, দাবি বা অধিকারের বিষয় গুলো মফস্বল সাংবাদিকদের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে স্থান পায়। মফস্বল সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল পেশাই নয়, বরং দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে।

সেই জায়গা থেকে যদি মফস্বল সাংবাদিক নাই থাকে তাহলে এই বিরাট সংখ্যক মানুষদের চারদিক থেকেই বঞ্চিত করা হয়। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সময় দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এক্ষেত্রে অনেক অভিযোগের মধ্যে খুবই কম অভিযোগ সামনে আসে। সামাজিক সমস্যার মধ্যে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌতুক সমস্যা, বাল্যবিবাহ, স্থানীয় মাতব্বরের দাপট- অনিয়ম, মাদকের ছড়াছড়ি ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে বন্যা, খরায় মানুষের ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, কম মূল্যে মজুরি, বিশেষ করে নারী মজুরিদের ক্ষেত্রে বৈষম্য ইত্যাদি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন- গ্রামের অসহায়, গরীবদের সরকারি অনুদান আসলেও প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছায় না। বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছে মতো সুবিধা আদায় করা হয় । কিন্তু এসব বিষয় কখনো জাতীয় পর্যায়ে যায় না, মফস্বল সাংবাদিকতার অভাবে। যার জন্য গ্রামের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। বছরের পর বছর খেটে খেয়ে জীবনযাপন করা লাগে। তাছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসেবার বিভিন্ন খাতে বাস্তবতা তুলে ধরা মফস্বল সাংবাদিকদেরই দায়িত্ব। সাংবাদিকতা পেশায় অবশ্যই সততা, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা থাকা চাই। কিন্তু বর্তমান সাংবাদিকতা হয়ে গেছে সরকারি মুখী। এছাড়া যেখানে ভিউ বেশি পাওয়া যাবে, সেখানে সকল সাংবাদিকদের ভীড়। ভাইরাল ইস্যুতে সবার মনোযোগ। কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকতায় প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেই।

তবে অনেক জায়গায় মফস্বল সাংবাদিক দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। প্রতিনিধি নিয়োগে রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিদের প্রাধান্য। আবার বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দেওয়া হয় না। ব্যক্তিগত জীবনে যেখানে অর্থের চাহিদা পূরণ হবে না সেখানে না যাওয়াই বাস্তবতা । অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিনিধি নিয়োগ দিলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে দক্ষতার অভাবে যথাযথ ভাবে চালিয়ে যেতে পারে না। তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের সত্যতা যাচাই, রিপোর্টিং করা ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। একজন পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য অবশ্যই প্রশিক্ষণ অপরিহার্য বিষয়। এছাড়া নিরাপত্তার অভাবও পরিলক্ষিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ের দূর্নীতি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতারা হুমকি, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপের মুখে রাখে।

মফস্বল সাংবাদিকতার এই সংকট মোকাবেলা করা অপরিহার্য। এর জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, স্থানীয় সংবাদকর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা, বিশেষত অনুসন্ধানী রিপোর্টিং ও ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে। তৃতীয়ত, মফস্বল সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে কার্যকর প্রেস কাউন্সিল ও সরকারি নীতিমালা প্রয়োজন। চতুর্থত, স্থানীয় বিজ্ঞাপনের বাজার তৈরি ও সরকারি বিজ্ঞাপন বরাদ্দে স্বচ্ছতা আনা দরকার। তাহলেই গ্রামীণ পর্যায়ের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা গুলো সামনে আসবে এবং সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।

মফস্বল সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল পেশাই নয়, বরং দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, দাবি, অধিকার এবং সমস্যার কথা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছায়। এটি কোনো সহজ কাজ নয়, একদিকে যেমন বিভিন্ন চাপ থাকে, আরেকদিকে প্রাতিষ্ঠানিক অসুবিধাও থাকে। তাসত্ত্বেও অনেকে স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতার কাজ করে যাচ্ছে। তাদের জীবনের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এই সমাজ ও দেশের যৌথ দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *