চালক যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে ক্ষমতায় নয় দায়িত্ববোধে

চৌধুরী রুহাশ

ভোর পাঁচটা। কুয়াশার আড়ালে চট্টগ্রামের বাসটার্মিনালে বাতি ঝলমল করছে। হালকা আর্দ্র বাতাস ধুলোর ঘ্রাণ বহন করছে। রহিম মিয়া স্টিয়ারিংয়ে বসে ইঞ্জিন ঘুরালেন। বাস হালকা কেঁপে উঠল—মাথার ভিতর ঘুমের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। চোখের নিচে রাতজাগার ছাপ। বুকপকেটে ভাঁজ করা কাগজ—মেয়ের স্কুলের বেতনের রসিদ। আজকের ট্রিপ শেষে জমা দিতে হবে।
বাসের ভিতরে তিরিশজন যাত্রী। কেউ আধো ঘুমে, কেউ ফোনে নিঃশব্দে কথা বলছে। জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে আছে এক বাচ্চা। চোখে কুয়াশার মতো কৌতূহল। হঠাৎ হেসে উঠল—রাস্তায় পড়ে থাকা ছোট আলো তার চোখে খেলতে খেলতে গায়ে ছোঁয়।
পাশের বৃদ্ধ হাতলে আঁকড়ে ধরে সামান্য এগোতে চাইছেন। বাসের হালকা কম্পনে চোখ বন্ধ করে ঝুঁকে গেলেন।
তরুণী বারবার চশমার লেন্স মুছছেন, যেন পরিষ্কার চোখে দেখার চেষ্টা করছেন অন্ধকারে লুকানো প্রতিটি ঝুঁকি।
রহিমের আঙুল স্টিয়ারিংয়ের উপর আলতো চাপ দিচ্ছে, মাঝে মাঝে হালকা জোর। হাতের ক্ষুদ্র নড়াচড়ায় বাসের পুরো বডি যেন তার নিঃশব্দ সঙ্গী। চোখ কাঁচের মধ্যে খুঁজছে অন্ধকার ফাঁটায় পথের প্রতিটি টানাপোড়েন।
ভেতরের কণ্ঠে রহিম:
“এই বাঁকটা ঠিকভাবে পার হতে হবে। সামান্য ভুলেই কেউ চোট পেতে পারে। চোখ ক্লান্ত, মন সতর্ক। আমি শুধু চালক নই; আমার হাতে তিরিশটি পরিবারের স্বপ্ন ঝুলছে।”
হঠাৎ, সামনে এক সাইক্লিস্ট ঝাঁপিয়ে এলো।
রহিম ধীরে ব্রেক চাপলেন। বাস সামান্য থমকে গেল। যাত্রীদের দেহ সামান্য ঝুঁকল।
এক মহিলা চেয়ারে শক্ত করে হাত ধরে বললেন, “ওই! সাবধানে।”
এক শিশু কানে হাত দিয়ে চিৎকার করতে চাইল, বাবা হালকা ঠেস দিল।
রহিম আঙুলের ক্ষুদ্র কম্পন দিয়ে ব্রেকের প্রতিক্রিয়া অনুভব করছেন—যাতে বাসের ভিতরে কারো দম না ওঠে।
হাওয়া জানালা দিয়ে ঢুকল—ছোট শিশুর চুল কপালে লেগে গেল, বৃদ্ধের চশমায় ছোট ছোট পানি জমল।
সাইক্লিস্ট পাশ কাটিয়ে গেল—ধুলো আর কংক্রিটের খসখসে শব্দ, বাসের টায়ার চাপার শব্দ সব মিলল এক বিন্দুতে।
এক যাত্রী বললেন, “ভাই, আজ কি তাড়াহুড়ো করবেন না? ”
রহিম হালকা হেসে মাথা নাড়লেন, ভেতরে বললেন:
“ধীরে যাওয়াটাই নিরাপত্তা।”
রাস্তা ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠল। ধুলো, আলো, শিশুর হাসি, বৃদ্ধের শিউরে ওঠা, বাসের ক্ষুদ্র কম্পন—সব মিলল এক নিঃশ্বাসে।
রহিম চোখ অন্ধকারের ফাঁকায় রাখলেন। মনে হল—আজকের যাত্রা নিরাপদ হলে, শুধু বাস নয়, তার নিজের নীরব সাহসও ফিরে পাবে।
রহিমেরও মনে পড়ে ইশকুলে তার মেয়ে,বাসায় তার স্ত্রী, মা… তাদের মায়া মাখা চেহারা, তার উপর নির্ভরশীলতা… তেমনি এই গাড়িতে যারা আছে তাদেরও পরিবার আছে…
রহিম মিয়া জানে এবং মানে – একটি স্টিয়ারিং বা একটি হাল — এ যেন কেবল যন্ত্রের অংশ নয়, এ হলো বিশ্বাসের ভার। যে মানুষ প্রতিদিন ভোরে ঘুমচোখে পথে নামেন, তিনি জানেন — তাঁর একটি মুহূর্তের অসাবধানতায় কারো সকাল চিরকালের জন্য থেমে যেতে পারে। তাই দায়িত্ব মানে শুধু নিয়ম মানা নয়; দায়িত্ব মানে অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের মতোই মূল্য দেওয়া।
পথ আমাদের একসাথে চলার জায়গা। সেই পথে যে চালক, যে যাত্রী, যে পথচারী — সবাই একে অপরের নিরাপত্তার অংশীদার। কেউ একা দায়ী নয়, কেউ একা মুক্তও নয়। নিরাপদ পথ তখনই তৈরি হয়, যখন প্রতিটি মানুষ নিজের জায়গা থেকে সচেতন থাকে — চালক তাঁর হাতে, যাত্রী তাঁর ধৈর্যে, রাষ্ট্র তার নজরদারিতে।
সে মনে রাখে — গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে বড় কথা হলো, সবাইকে নিয়ে পৌঁছানো।

একটি সমাজের চলাচল কেবল রাস্তা বা নদীর ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই মানুষগুলোর ওপর, যারা এই পথগুলোর দায়িত্ব হাতে তুলে নেয়। রাজপথে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার কিংবা জলপথে লঞ্চ, ট্রলার, স্পিডবোট — সব কিছুর চালকের হাতেই থাকে অসংখ্য জীবনের নিরাপত্তা। তাই চালক কেবল একটি পেশা নয়; এটি এক গভীর দায়িত্বের নাম। একটি ইউনিফর্ম বা একটি লাইসেন্স মানুষকে চালক বানায় না — বানায় সেই বোধ, যা বলে: এই মুহূর্তে আমার হাতের ওপর অনেকের জীবন নির্ভর করছে।

পেশাটি যতটা সাধারণ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। প্রতিদিন ভোরবেলা একজন বাসচালক যখন স্টিয়ারিং ধরেন, তখন তিনি জানেন না — রাস্তায় কোথায় কোন বাধা অপেক্ষা করছে, কোন মোড়ে কোন অসতর্ক পথচারী হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াবে, কিংবা কোন যানজটে হয়তো তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হবে। তবু তিনি বের হন। যাত্রীদের ভরসা নিয়ে, পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে। এই নীরব কর্তব্যপরায়ণতা সমাজের অন্যতম শক্তি, যা আমরা প্রায়ই স্বীকার করতে ভুলে যাই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখি, গতি যেন দক্ষতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্রুত পৌঁছানো যেন সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর সংস্কৃতি অনেক সময় নিরাপত্তাকে পিছনে ঠেলে দেয়। এক মুহূর্তের অসতর্কতা, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, কিংবা নিয়মকে অগ্রাহ্য করা — এসবই মুহূর্তে একটি দুর্ঘটনাকে জন্ম দিতে পারে। তখন শুধু একটি যানবাহন নয়, ভেঙে যায় বহু পরিবারের স্বপ্ন। কোনো একটি দুর্ঘটনার সংবাদ পড়তে গেলে কেবল সংখ্যা দেখা যায় — তিনজন নিহত, দশজন আহত। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে থাকে একটি মায়ের কান্না, একটি শিশুর অনাথ হয়ে যাওয়া, একটি পরিবারের নিঃশব্দ ভেঙে পড়া।
চালকদের ওপর একতরফা দায় চাপানো সহজ। কিন্তু প্রশ্ন করা দরকার — এই মানুষটি কতক্ষণ ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন? তিনি কি পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছেন? তাঁর শরীর কি সুস্থ? মালিকপক্ষের চাপ, ট্রিপের লক্ষ্যমাত্রা, যাত্রীদের তাড়া — সব মিলিয়ে একজন চালকের মানসিক অবস্থা কতটা চাপের মধ্যে থাকে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তাই দুর্ঘটনার কারণ শুধু চালকের ভুল নয়; অনেক সময় সেটি একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা।

রাজপথে দুর্ঘটনা যেমন আমাদের উদ্বিগ্ন করে, তেমনি জলপথের ঘটনাগুলোও কম ভয়াবহ নয়। নদীমাতৃক এই দেশে জলযান কেবল পরিবহন নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক বাস্তবতা। হাওরের মানুষ নৌকায় বাজার করেন, দ্বীপবাসী স্পিডবোটে হাসপাতাল যান, গ্রামের মানুষ লঞ্চে শহরে আসেন স্বপ্ন নিয়ে।
এই প্রতিটি যাত্রায় নৌযানের চালকের দায়িত্ব অপরিসীম। আবহাওয়া, স্রোত, কুয়াশা, অতিরিক্ত যাত্রী — সবকিছু বিবেচনা করে তাকে মুহূর্তে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটু অসাবধানতায় নদীর বুকে ডুবে যেতে পারে অনেক মানুষের আশা।
বাংলাদেশে নৌদুর্ঘটনার একটি বড় কারণ অতিরিক্ত যাত্রীবহন। উৎসবের মৌসুমে, ঈদের ছুটিতে লঞ্চগুলো ধারণক্ষমতার বহুগুণ বেশি মানুষ নিয়ে চলে। চালক সেখানে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না — মালিকের নির্দেশ, টাকার হিসাব, ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখের দিকে না তাকাতে না পারার অসহায়ত্ব — সব মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক যাত্রা শুরু হয়। এই জায়গায় কেবল ব্যক্তির সচেতনতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর নজরদারি এবং আইনের প্রয়োগ।

এই কারণেই বলা যায়, রাজপথে হোক বা জলপথে — চালক যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তবে সেই ঊর্ধ্বে থাকা ক্ষমতার কারণে নয়, দায়িত্ববোধের কারণে। একজন চালকের হাতে শুধু একটি স্টিয়ারিং বা একটি হাল থাকে না; থাকে মানুষের আস্থা। সেই আস্থাকে সম্মান করাই একজন সত্যিকারের চালকের পরিচয়।
রাষ্ট্রকেও এখানে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ, কাজের সময়সীমা নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা — এগুলো কেবল চালকের সুবিধার জন্য নয়, এগুলো আসলে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্যই জরুরি। একজন ক্লান্ত, বঞ্চিত, মানসিক চাপে থাকা চালক নিরাপদ পরিবহনের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না।
সমাজেরও এখানে ভূমিকা আছে। আমরা যাত্রীরা অনেক সময় দ্রুত যাওয়ার চাপ দিই, কখনো কখনো নিয়ম ভাঙাকে প্রশ্রয় দিই। অথচ নিরাপত্তা একটি সম্মিলিত সংস্কৃতি। চালক, যাত্রী, প্রশাসন — সবার সচেতনতা ছাড়া নিরাপদ পথ তৈরি হয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, কয়েক মিনিট দেরি হলে ক্ষতি নেই; কিন্তু একটি দুর্ঘটনা ঘটলে সেই ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়।
পথ যত বড়ই হোক, গন্তব্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো দায়িত্বশীল চালনা। কারণ রাজপথে বা জলপথে, চালকের সচেতন হাতই হতে পারে অসংখ্য জীবনের নিরাপদ আগামী। আর সেই হাতকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব কেবল চালকের একার নয় — এটি আমাদের সকলের, এই সমাজের, এই রাষ্ট্রের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *