মৃত্যুমিছিলের মহাসড়ক

উড়নচণ্ডী সাইদী বোরহান

​বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার হার যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তাকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলা আর সম্ভব নয়; এটি যেন এক নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশের রাজপথগুলো হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী।

​দুর্ঘটনার খতিয়ান (সাম্প্রতিক চিত্র)
​পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসটি ছিল গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে:
​মার্চ ২০২৬: মাত্র এক মাসে ৬১৬টি দুর্ঘটনায় ৬১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
​ঈদ যাত্রা: গত ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে প্রায় ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন।
​ভয়াবহ কিছু ঘটনা: কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষ (১২ মৃত্যু), দৌলতদিয়ায় বাসে নদী পতন (২৬ মৃত্যু) এবং সদরঘাটের লঞ্চ ট্র্যাজেডি পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

​কেন থামছে না এই মিছিল?
​দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে কাঠামোগত এবং মানবিক—উভয় কারণই দায়ী:
​বেপরোয়া গতি ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা: মহাসড়কে ওভারটেকিং এবং গতির তীব্র প্রতিযোগিতা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
​যান্ত্রিক ত্রুটি: ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপট এবং ব্রেক ফেল করার মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
​লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক: সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়া চালকের আসনে বসার কারণে চালকরা জরুরি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারান।
​মহাসড়কে ছোট যানবাহনের দাপট: দ্রুতগতির লেনে ধীরগতির ইজি-বাইক বা নসিমনের উপস্থিতি পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
​আইনের দুর্বল প্রয়োগ: ট্রাফিক আইন ভঙ্গের পরও কঠোর শাস্তির অভাব অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

​সমাধানের পথ: যা করা জরুরি
​দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:
​আইনের কঠোর বাস্তবায়ন: সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর শতভাগ প্রয়োগ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
​স্মার্ট ট্রাফিকিং: মহাসড়কে সিসিটিভি ও স্পিড ডিটেক্টর বসিয়ে স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা চালু করা।
​বিপজ্জনক মোড় সংস্কার: রাস্তার ‘ব্ল্যাক স্পট’ বা বিপজ্জনক মোড়গুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সংস্কার করা।
​ফিটনেস ও প্রশিক্ষণ: ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে নামিয়ে দেওয়া এবং চালকদের আধুনিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।

​উপসংহার:
​সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একেকটি পরিবারের স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। সরকার, মালিক-শ্রমিক এবং সাধারণ পথচারী—সবাই মিলে সচেতন না হলে এই রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব নয়। সড়ক হোক নিরাপদ, প্রতিটি যাত্রা শেষ হোক হাসিমুখে।

​তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
১. বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি
২. রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (RSF)
৩. বিআরটিএ (BRTA)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *