বিশ্ব বই দিবস ও বর্তমান প্রজন্মের বই পাঠের চিত্র

নায়িমা আখতার : বই হলো এমন এক জাহাজ যা সময়ের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জ্ঞানকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দেয় । ১৯৯৫ সালের ২৩ এপ্রিল UNESCO প্রথমবারের মতো বিশ্ব বই দিবস উদযাপন শুরু করে। এরপর থেকে প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে “বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস” পালিত হয়ে আসছে। তবে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে এই দিবসটি মার্চ মাসে আলাদাভাবে উদযাপন করা হয়।

এই দিবসকে কেন্দ্র করে ইউনেস্কো বই শিল্পের বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি উপদেষ্টা কমিটির সহায়তায় প্রতি বছর একটি শহরকে “ওয়ার্ল্ড বুক ক্যাপিটাল” হিসেবে নির্বাচন করে। নির্বাচিত শহরটি এক বছরের জন্য বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, প্রকাশনা শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া এবং জ্ঞানচর্চা বিস্তারের লক্ষ্যে নানামুখী কর্মসূচি ও আয়োজন পরিচালনা করে। ২০২৬ সালের জন্য মরক্কোর রাজধানী রাবাত শহরকে ওয়ার্ল্ড বুক ক্যাপিটাল হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। এ দেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ৩টি বই পড়েন।আমাদের দেশে পাঠকের অভাবে শতশত পাঠাগার যেনো পরিণত হচ্ছে জাদুঘরে।

আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের দিকে তাকালে একটি দৃশ্য চিরচেনা ছিল বিকেলে বারান্দায় বসে বা রাতে শোবার আগে বই হাতে নিয়ে ডুবে যাওয়া। তখন বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত, কিন্তু কল্পনার আকাশ ছিল অসীম। জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেন কিংবা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত ছিল তাদের কৈশোরের সঙ্গী। বর্তমানে স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ছোট ক্লিপ আমাদের মনোযোগের সময় (Attention Span) কমিয়ে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের রিলস দেখে অভ্যস্ত মস্তিস্ক এখন তিনশ পৃষ্ঠার উপন্যাসে মনোনিবেশ করতে হাঁপিয়ে ওঠে।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের জীবন সিজিপিএ আর বিসিএস এর গোলকধাঁধায় বন্দি। পাঠ্যবইয়ের পাহাড় ডিঙিয়ে তারা যখন অবসরে যায়, তখন তাদের মস্তিস্ক এতটাই ক্লান্ত থাকে যে তারা সহজ বিনোদন হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং বা গেমিং বেছে নেয়। বই পড়ার অভ্যাস এখন বিলুপ্তপ্রায়।

আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই চাকরি-কেন্দ্রিক। “পড়াশোনা করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”—এই প্রবাদটিকে আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গিয়ে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ‘মননশীলতা’ ভুলে গেছি। একাডেমিক সিলেবাসের বাইরে বই পড়াকে অনেক অভিভাবক সময়ের অপচয় বলে মনে করেন।

বই পড়া কেবল সময় কাটানো নয়, এটি একটি মানসিক ব্যায়াম।গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস আলজাইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

বই পড়লে মানুষ অন্যের জুতোয় পা গলাতে শেখে। একটি গল্পের চরিত্রের বেদনা যখন পাঠককে স্পর্শ করে, তখন সে বাস্তব জীবনেও মানুষের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়। ডিজিটাল স্ক্রিন যেখানে মস্তিস্ককে উত্তেজিত করে, সেখানে বই পড়ার অভ্যাস রক্তচাপ কমায় এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়।

একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোকিত করতে বইয়ের চেয়ে বড় হাতিয়ার আর নেই। কুসংস্কার আর সংকীর্ণতা দূর করতে হলে বইয়ের বিকল্প নেই।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *