নীল পর্বতের নীরবতা

শাহাদত হোসাইন

ঢাকার ব্যস্ত শহর।জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি।
দিগন্তহীন ভবন,কাঁচের দেয়ালে আটকে থাকা সূর্যরশ্মি, ক্লান্ত মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, জীবনটা যেন একটি নকল গল্পের মতো চলছে।কোন কাজেই যেন মন বসছিল না।হঠাৎ মাথায় বন্ধুদের নিয়ে এবার ছুটিতে একটা সফরের আয়োজন করার বাসনা জেগে উঠল।ছুটিতে বাড়িতে এসেই নিজের মনের সুপ্ত বাসনা বন্ধু মহলে পাড়লাম।

একি!ওদের আগ্রহ দেখি আরো দিগুণ।বন্ধুদের আগ্রহ আরো বেশি উদ্বুদ্ধ করল আমাকে।সবার উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
তাই আর দেরি না করে সবাই মিলে ঝটপট সফরের একটা প্ল্যান তৈরি করে ফেললাম।
সফরের গন্তব্য নির্ধারণ করা হল—বান্দরবান।

ছোটবেলার স্বপ্ন—কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, গাঢ় সবুজে মোড়া পথ, আর তার ওপরে দাঁড়িয়ে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস—সব কিছু এক মুহূর্তে ভেসে উঠল চোখের সামনে। বুকের ভেতর থেকে কে যেন বলল,
“চলে যা। এবার নিজেকে ফিরে পাওয়ার সময়।”

প্ল্যান মোতাবেক পরদিন ভোর ৫টার বাসে উঠ ে পড়লাম সবাই।সবার চোখে একটিই ভাষা—আবিষ্কারের আনন্দ। বাস ছুটে চলল, শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে।

চট্টগ্রামের পর হঠাৎ পাহাড়ের আভাস। ঢেউয়ের মতো করে পাহাড়ের পর পাহাড়। প্রকৃতি যেন আস্তে আস্তে আমাকে বুকে টেনে নিচ্ছিল। গাছেরা জানালার পাশে মাথা নাড়ছিল, যেন বলছে,
“স্বাগত বন্ধু,স্বাগতম।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। আমরা পৌঁছালাম নীলগিরির পাদদেশে। তাজা বাতাসের গায়ে যেন ছুঁয়ে ছিল কুয়াশার আলতো হাত। পরদিন ভোরে যখন চূড়ায় উঠলাম, তখন সূর্য উঠছে ঠিক মেঘের নিচ থেকে। চারপাশে শুধু সাদা মেঘের ঢেউ, আর তার মাঝে আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক নিঃশব্দ স্বর্গে।

কেউ কিছু বলছিল না। শুধু নীরবতা, আর নীরবতার মাঝেও পাহাড়ের হৃদয়ভাষা:
“যারা হৃদয়ে শুনতে জানে, প্রকৃতি তাদের সঙ্গে কথা বলে।”

সেদিন দুপুরে পাহাড়ের ঢালে হেঁটে হেঁটে গেলাম এক ছোট্ট আদিবাসী গ্রামে। সেখানে দেখা হল এক রাখাল ছেলের সঙ্গে। তার হাতে একটি বাঁশি। সে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল, যেন মেঘেদেরও মন কাঁদাতে চাইছে।

আমি পাশে গিয়ে বসলাম। সে বলল,
— “আপনারা তো আসেন, ছবি তুলে চলে যান। আমরা এখানে থেকেই পাহাড়ের নীরবতা বুঝি। এখানে শব্দ নেই, কিন্তু গল্প আছে। প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঝরনা আমাদের দাদা-নানাদের কাহিনি বলে।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সে দি ন আমি বুঝলাম, প্রকৃতি শুধু দেখার নয়, অনুভবের।

ফিরতি পথে আমি আর আগের আমি ছিলাম না। বারবার কাছে টানছিল নীলগিরির নীরবতা, কানে ভাসছিল রাখাল ছেলের বাঁশির সেই সুর, আর হৃদয়ে ছিল এক গভীর উপলব্ধি:
“ভ্রমণ মানে শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, আত্মার সাথে নিজের পুনঃসাক্ষাৎ।”

বাস ঢাকার দিকে এগোচ্ছিল। শহরের কোলাহল, শব্দ, জটলার মাঝে আমি হাসছিলাম এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। পাহাড় আমাকে যা দিয়েছে, তা কোনো শব্দে বলা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।

নীলগিরির সেই ভ্রমণ আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আজও যখন ক্লান্ত লাগে, আমি চোখ বন্ধ করে শুনি রাখাল ছেলের বাঁশি, আর মনে মনে পাহাড়কে বলি:
“তুমি আমাকে নিঃশব্দে বাঁচতে শিখিয়েছো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *