সড়ক দুর্ঘটনা : স্বাধীনতার এক বিষাদময় বাস্তবতা

ফারজানা আক্তার : স্বাধীনতার প্রায় ৫৫ বছর পর, ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়ে এসেও যখন বাংলাদেশের সড়কের সুশৃঙ্খলতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন একে দুর্ঘটনা না ধরে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলাই শ্রেয়। যখন একজন নাগরিক জীবিকার সন্ধানে বা পরিবারের প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে লাশ হয়ে ফেরেন তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত মৃত্যু নয় বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়। দেখা যায় একটি পরিবারের একের অধিক কিংবা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যখন বাস,ট্রাক বা নানা যানবাহনের তলায় পিষ্ট হন তখন কেবল একটি প্রাণ যায় না ধূলিসাৎ হয় একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের একটি সম্পদ ।

বাংলাদেশে ঘর থেকে বের হয়ে সুস্থভাবে ফিরে আসাটা এখন এক বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার যে মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়ার কথা, সড়ক দুর্ঘটনার মিছিল সেই অধিকারগুলোকে তীব্র উপহাসে পরিণত করছে। কথায় আছে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের নিরাপত্তাহীনতা ও তাজা প্রাণের প্রতিদান তারই ইঙ্গিত বহন করছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর যখন অর্জন আর বিসর্জনের হিসাব মেলাই তখন প্রশ্নবিদ্ধ করতেই হয় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবনের মূল্য কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা, মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা সচল হলেও নাগরিক জীবন আজও জাতাঁকলে পিষ্ট।

উন্নয়নের চাকা ঘোরার বদলে অনেক পরিবারে চিরতরে থেমে যাচ্ছে সুখের চাকা। ভাগ্য পরিবর্তনের খোঁজে,পেটের দায়ে ছুটোছুটি করা মানুষের যদি অকাল মৃত্যুই শেষ ঠিকানা হয় তবে এই স্বাধীন বাংলাদেশের সার্থকতা কোথায়। অস্বীকারের মতো নয় যে স্বাধীনতার পর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাপক হলেও সড়কের নিরাপত্তা এখনো নড়বড়ে। স্বাধীনতার প্রাপ্তি কখনোই অকাল মৃত্যু হতে পারে না বরং অকাল মৃত্যু হলো এই দেশের উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায় এবং ব্যর্থতা। ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি, অপরিকল্পিত সড়কের কারণে প্রতিদিন বহু মানুষের অকাল মৃত্য ঘটছে, যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনকই নয় একইসাথে জাতিগতভাবে লজ্জাজনক । প্রায় ৭৫,০০০-এর বেশি বাস ও ট্রাক রয়েছে যেগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের গবেষণা বলছে, প্রায় ৪২% দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে চালকদের বেপরোয়া গতি। সড়ক দুর্ঘটনার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় দোষী চালক বা মালিক পার পেয়ে যাচ্ছেন। আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় অপরাধীদের সুরক্ষা দেয়। যখন কোনো অপরাধের শাস্তি হয় না তখন সেই অপরাধ বারবার ঘটার সুযোগ তৈরি হয়।সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ব্যক্তিগত সচেতনতা, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। চালকদের বেপরোয়া গতি পরিহার, মোবাইল ব্যবহার না করা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্তি দূর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গাড়ির নিয়মিত ফিটনেস চেক, ওভারটেকিং প্রবণতা বর্জন এবং ট্রাফিক সাইন মেনে চললে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। এছাড়া, মহাসড়কে অবৈধ ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ, সড়ক বাতি স্থাপন, উল্টো পথে গাড়ি চালানো রোধ এবং তরুণ প্রজন্মের বাইক, সাইকেল হ্যালমেট ব্যবহার ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দুর্ঘটনার হার কমাতে অত্যন্ত কার্যকরী। উন্নয়ন অর্থ শুধু বড় বড় ফ্লাইওভার বা হাইওয়ে নয়, উন্নয়ন মানে সেই রাস্তায় নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রযুক্তি-নির্ভর ট্রাফিক আইন এবং কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করা হচ্ছে। এর মধ্যে AI-ভিত্তিক ক্যামেরা নজরদারি, ড্রাইভিং লাইসেন্স ডিজিটালাইজেশন এবং ২০১৮ সালের আইনের ১০৫ ধারা অনুযায়ী বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোয় ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা না আনা পর্যন্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো অধরাই থেকে যাবে।

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বড় অর্জনগুলো তখনই পূর্ণতা পাবে যখন প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত হবে। নাগরিকের অকাল মৃত্যু বা জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্যই একটি বেদনাদায়ক এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়। আমরা নিয়তির হাতে নিজেদের সঁপে দিতে পারি না। সড়কের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের অধিকার। যদি রাষ্ট্র কঠোরভাবে নিরাপদ সড়ক আইন বাস্তবায়ন করে, দুর্নীতির জাল ছিঁড়ে লাইসেন্স ও ফিটনেস প্রদান স্বচ্ছ করে এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে তবে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব। উন্নত অবকাঠামো যেন আমাদের লাশের ট্রলি না হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র, চালক, মালিক এবং পথচারী,সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তবেই সড়কের এই রক্তপাত বন্ধ হবে এবং গন্তব্য হবে নিরাপদ। সামষ্টিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তার চাকা সচল করার কারিগর তথা নাগরিক সম্পদ হারাবে না এবং কোনো পরিবার হারাবে না তাদের প্রিয়জনকে।

লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *