নোবল বিজয়ী বই -আমি অন্ধকার থেকে বের হতে পারি না

খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি : “আমি পৃথিবীর সব জায়গায় আমার মায়ের ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছি। তাঁকে নিয়ে আমি যা লিখছি এটা কোনো সাহিত্যচর্চা নয়। এই লেখার সাথে আমার লেখা অন্য বইগুলোর পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি আমি। না, তাও না, বরং যা লিখতে চাচ্ছি তা কীভাবে লিখতে হয় আমি তা জানি না। আমার চাওয়াটা হচ্ছে, জীবনের একটা অধ্যায়কে সংরক্ষণ করে রাখা, এটাকে বুঝতে, সবার আগে এটাকে উদ্ধার করে আনতে”—- বই থেকে
‘আমি অন্ধকার থেকে বের হতে পারি না’ বইটি আলঝেইমারে আক্রান্ত আনি এর্নোর মায়ের গল্প। আনি এর্নোর মা এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্নক আহত হওয়ার দুই বছর পর স্মৃতিশক্তি হারাতে শুরু করেন।কয়েকমাসের জন্য তিনি বৃদ্ধাশ্রমে এক রুমের একটা বাসা ভাড়া করে নিজের মত থাকতেছিলেন।হঠাৎ তীব্র গরমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান এবং জানা যায় তিনি বেশ কিছুদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া করেননি,এমনকি পানিও খাননি।আনি চেয়েছিলেন তার মা কে নিজের বাসায় নিয়ে আসবে এবং তিনি নাতিদের সঙ্গ পেলে ভালো থাকবে।কিন্তু পরিস্থিতি অবন্নতির দিকে যায়।আনির মা পরিচিতজন,পরিচিত জায়গা কাউকেই চিনতে পারছিলেন না।এমনকি এনিকেও না!ডাক্তার আলজঝেইমার রোগের আশঙ্কার কথা জানান।

এরপর কয়েকমাস হাসপাতালে থাকার পর তাকে প্রবীণ সেবাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।আনি যখন তার মা’কে হাসপাতালে দেখতে যেতো তখন তার ছোটবেলার ঘটনা গুলো যেন তার সাথে পুনরায় ঘটতে থাকে।শুধু মায়ের স্থানে আনি আর আনির স্থানে তার মা।এই যেমন ছোট বেলায় আনি কাপড়চোপড় ভিজিয়ে ফেলতো আর তার মা সেগুলো বদলে দিতো আর এখন আনির মা তাঁর নিজের কাপড়চোপড় ভিজিয়ে ফেলে আর এনি সেটা পরিষ্কার করে।আবার আনি যখন তার মা কে দেখতে যায় আশ্রমে তখন তার মা তাঁকে দরজায় দেখেই দাড়িয়ে যায়।তখন আনি কল্পনা করেন যে,এক সময় স্কুলের খেলার মাঠে সে অপেক্ষা করতো আর তার মা যাওয়ামাত্রই তার পায়ে লাফ দিয়ে পড়তো। ঠিক এ কথার মতো সব পুনরায় ঘটছিলো “মেয়েরা বড় হলে মা হয়ে যায়”।
একদিন আনি তার মায়ের পরিষ্কার করে দেয়া শীতল মুখ দেখে বুঝে চোখের দৃষ্টি গুলো অভিব্যক্তিহীন।সে ভাবে“আমার শৈশবে দেখা তাঁর সেই চোখ জোড়া কোথায়?ত্রিশ বছর আগের ভয়ংকর চোখজোড়া! সেই চোখগুলোই কি আমাকে তৈরি করেছে?”
ধীরে ধীরে আনির মায়ের অবস্থা খারাপ হতে থাকে।আনি বুঝতে পারে তার মা হয়তো বেশিদিন বাঁচবে না।সেই প্রবীণ আশ্রমে আনি তার মা’কে প্রায়ই দেখতে যায়।একেকদিন গিয়ে একেকরকম আচরণ দেখে।আর বাসায় ফিরে তার মায়ের সাথে কাটানো সময়,মায়ের আচরণ এসব লিখতে থাকে ডায়েরিতে।আনি চায় তার মা পাগল হলেও বেঁচে থাকুক।কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী তা কি আর হয়!সেই প্রবীণ সেবাকেন্দ্রেই ৭৯ বছর বয়সে আনির মা মারা যায়।
আনির মায়ের লিখা শেষ বাক্য ছিলো “আমি অন্ধকার থেকে বের হতে পারি না”।বোধহয় এখান থেকেই বইয়ের নাম।

উল্লেখ্য : বইয়ের লেখক-আনি এর্নো এবং অনুবাদক – নূরুল আলম।

রিভিউ লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *