খাদ্য অপচয় : বিলাসিতা না অন্য কিছু?

খাদ্য অপচয় হচ্ছে বিশ্ব জুড়ে। যখন জানা যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়ার চেয়ে বেশি অপচয় হয় বাংলাদেশে, তখন বিস্মিত হতে হয়। এমনকি উদ্বেগও দেখা দেয়। দুনিয়াতে প্রতি বছর যত খাবার উৎপাদন হয়, তার একটি বড় অংশ মাঠ থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছায় না। সেটি অপচয় হয়ে যায়। আর খাদ্য অপচয়ের ক্ষেত্রে উন্নত, উন্নয়নশীল আর অনুন্নত কোনো দেশই বাদ যায় না। বাংলাদেশে প্রতি বছর যত খাবার উৎপাদন হয়, তারও একটি বড় অংশ ভাগাড়ে যায়। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউনেপ ২০২১ সালে ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স নামে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ১ কোটি ৬ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। আর ২০২৫ সালে জানা যাচ্ছে উৎপাদন পর্যায় থেকে খাবারের প্লেটে যাওয়া পর্যন্ত দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। এটি দেশে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ সমান। অথচ এখনো দেশে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গত সোমবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), বিশ^ কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) এবং ডেনমার্ক দূতাবাস একটি সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

সেমিনারে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, কৃষকরা পরিশ্রম করে উৎপাদন করলেও সংরক্ষণ, অবকাঠামো ও ন্যায্য দামের অভাবে বিপুল খাদ্য অপচয় হয়। দুধ, ডিম, মাছসহ নিত্যপণ্যে পরিবহন ও কোল্ডস্টোরেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্যও অবৈধ জাল ও অপচয়ের কারণে মজুদ হুমকিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা ডিজিটাল কৃষি, শীতল শৃঙ্খল (কোল্ড চেইন), স্মার্ট প্যাকেজিং, বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন, জৈব বর্জ্য নিষিদ্ধকরণ, খাদ্যদান উৎসাহীকরণ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও কৃষকদের আর্থিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে বিশ্বে ২০২২ সালে বাসাবাড়ি, খাদ্যসেবা ও খুচরা পর্যায়ে মোট খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ অর্থাৎ ১০০ কোটি টনের বেশি খাবার অপচয় হয়েছে। ওই সময় বাংলাদেশে গড়ে একজন ব্যক্তি বছরে ৮২ কেজি খাবার অপচয় করেছেন। ইউনেপের রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় হয় চীনে। সেখানে বছরে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ৯ কোটি ১৬ লাখ টন। আর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ খাদ্য অপচয় হয় বাংলাদেশে। এফএওর গবেষণায় দেখা গেছে, শস্যদানা মানে চাল, গম ও ডাল এসব উৎপাদন থেকে মানুষের প্লেট পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই প্রায় ১৮ শতাংশ অপচয় হয়। ফল আর সবজির ক্ষেত্রে অপচয় হয় ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা এখন মধ্যম আয়ে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের যে হিসাব তা যথেষ্ট বেশি বলে মনে করেন গবেষকরা।

আসলে অপচয় হচ্ছে তিনভাবে। এক হচ্ছে, উৎপাদন। এরপর ব্যবহার এবং তারপর মনোবৃত্তি। আমাদের জানা দরকার, বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর জন্য ভবিষ্যতে আরও খাদ্যের দরকার হবে। শুধু অপচয় বন্ধ করে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন গবেষকরা। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করলে, এই ভয়ানক মানসিকতা থেকে মুক্তি মিলতে পারে। সরকারের সুপরিকল্পিত নীতিমালা এবং সচেতনতার বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *