প্রথম দেখায় ইতি

জান্নাতুল মাওয়া (রিফাত)

আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিনক্ষণ যেন ঠিকই হয়ে দাঁড়িয়েছিলো আষাঢ়ের এক পশলা বৃষ্টিমুখর দুপুরে। কোনো এক চায়ের টং-এ দাঁড়িয়ে, ঝুম বৃষ্টি মাথায় করে টাপুরটুপুর রোদ–বৃষ্টি উপভোগ করতে করতে। আর সাথে এক কাপ চা নিয়ে গল্পে ডুবে একে অপরের প্রতি মনোমুগ্ধ হওয়া। কিন্তু তা আর হলো কোথায়! আষাঢ়ের আর একদিন বাকি। সেদিনও আমার অনার্স ২য় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা চলমান।

সব স্বপ্নেরই তো মাটিতে জন্ম হয় না—কিছু ইচ্ছে, কিছু স্বপ্ন আর কিছু কল্পনা আকাশেই ভাসমান থাকে।

সেই অপেক্ষয়মান সাক্ষাৎ বাস্তবায়িত হলো কার্তিক মাসের ৪র্থ সপ্তাহে। সেদিন ছিলো আমাদের প্রথম দেখা। হাতে শুধু একটি কলম নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আর এইদিনের কিছুদিন আগেই জানতে পেরেছিলাম—ইয়ামিন বকুল ফুল ও কাঠগোলাপ খুব পছন্দ করে। তবুও কেন জানি, সেই ফুল দুটো নিতে আমার যেন সাহস হলো না।

ইয়ামিনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবছিলো। আমি রাস্তা পার হলাম—আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ইয়ামিন এসে পৌঁছালো। আমরা যেন সমান্তরাল দুই বিপরীত পথের পথিক হয়ে রাস্তার মাঝখানে থমকে দাঁড়ালাম। তাকিয়ে দেখি—ইয়ামিনের গায়ে খয়েরি রঙের একটি পাঞ্জাবি, আর আমিও সেদিন কোন পরিকল্পনা ছাড়াই একই রঙের জামা পড়েছিলাম। আমাদের রঙের এমন আকস্মিক মিল আমাকে সেদিন বিস্মিতই করেছিলো। যেন প্রকৃতি আমাদের না জানিয়ে আগেই কোন রঙ মেলানোর রঙিন গল্প সাজিয়ে রেখেছিলো।

আমি তাকিয়ে থাকতেই ইয়ামিন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
—আসতে সমস্যা হয়নি তো?
আমি হালকা হাসি চেপে বললাম,
—অপেক্ষাটা তাহলে কে করালো?
ঠান্ডা সুরে সে বললো,
—ক্ষমাপ্রার্থী, সুরসন্ধ্যা।

এই নামটা তার মুখে শুনে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। এই প্রথম তার কন্ঠে এই শব্দমালার উচ্চারণ শুনলাম। ইয়ামিনের চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো তার চোখ থেকে নিঃশব্দে অসংখ্য কথার মুক্তামালা ঝরে পড়ছে—আর সেই আলো আমার বুকের ভেতর কোথাও শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কথার প্রসঙ্গ বদলে ইয়ামিন বললো,
—আপনাকে তো আমি কবিতাতেই শুনেছি। আজ সামনাসামনি পেলাম।

আমি লজ্জা লুকিয়ে বললাম,
—বইগুলো এনেছেন?

সে আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
—তাড়া আছে?

আমি না চাইতেই বললাম,
—সন্ধ্যা নেমে আসছে… যেতে হবে।

ইয়ামিন হেসে বললো,
—চা? অপূর্ণ রয়ে যাবে চা-বিনা এই পরম মুগ্ধকর সাক্ষাত ।

ঘরে ফেরার একটু পরই বৃষ্টি শুরু হলো। অথচ এই বৃষ্টিই আমাদের প্রথম দেখার সাক্ষী হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কি অদ্ভুতভাবে, সেই বৃষ্টি যেন আমাদের ছুঁতেই পারেনি—হয়তো একেই বলে অপূর্ণতা। বিদায়ক্ষণে নিয়নের আলোয় ভরা ব্যস্ত শহরের ভিড়ে আমি তার হাঁটতে থাকা পদচিহ্ন টুকু দেখতে থাকলাম। যেন ওই মুহূর্তটাই আমাদের শেষ বিদায়ের ঘন্টা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

সেদিনই ছিল আমাদের প্রথম দেখা, প্রথম কথা। অথচ এ কথাই যে শেষ কথা হয়ে থাকবে—তা আমাদের দু’জনেরই অজানা।

বাড়িতে ফিরে জানতে পারলাম—আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আর বন্ধুরা জানালো—ইয়ামিন আমাকে হন্তদন্ত হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে! অথচ আমাদের ইতি-কথা তো আগেই লেখা ছিল ভাগ্যের পাতায়।

সেদিন সে বলেছিলো,
—চলেন, একসাথে চা খাই।

সেই আধ-খাওয়া চা-ই আমাদের চলার পথকে অপূর্ণ রেখে দিলো। মুহূর্তের সেই গভীর অনুভূতি—জীবনের এক বড় ছলনা হয়ে রইলো। এভাবে অল্প কথার আমাদের গল্পটা অকালে ঝড়ে পড়লো।

লেখক পরিচিতি : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
বিভাগ:-ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *