ভ্রমণ স্মৃতির পাতা

কথা ছিল ভ্রমণের গল্প লিখব, লিখবো পথ চলার কথা, সোনালি ডানায় ভর দিয়ে, হলুদ রোদ্দুর মেখে উঁচু আরও উঁচুতে উড়ে যাওয়ার কথা লিখবো, কিন্তু, সময়টা যখন অন্যরকম, গৃহ বন্দীর সময় – মানস ভ্রমণ তখন।

না, বসে ভ্রমণ স্মৃতির পাতা ওলটাতে হয় না। বর্ষার জলো হাওয়ার ঝাপটার মতো, বা শীতের শুকনো ঠাণ্ডা হাওয়ার মতো এক একটা ভ্রমণ স্মৃতি মনে ভেসে ওঠে।

কাজের ফাঁকেই হঠাৎ করে বার্সিলোনার সেই পুরনো গথিক পথে কিংবা দুব্রভনিকের কোনো এক অচিন গলির মোড়ে বা রোমের ধ্বংসাবশেষের পাশের রাস্তাটার মোড়ে কখনও বা পশ্চিম ঘাটের মাথেরন পাহাড়ের সেই পাহাড়ের ঢালে নিজেকে পাই।

কখনো বা বেভেরিয়ার হলুদ ফুলের মাঠের পাশ দিয়ে ট্রেনে চাপার অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে যায় – কোন কারণ ছাড়াই মনে পড়ে – সেই হলুদ ফুলের মাঠ ও নীল আকাশ আশ্চর্য এক ছবি তৈরি, যে ছবি আমার মন ভ্রমণের অংশ হয়ে যায়।   

সেই দুরন্ত এক হলুদ দুপুরে ইস্টনিয়ার এক বাস স্টপে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষার সেই অনিশ্চয়তার অনুভূতি ছুঁয়ে যায়।  বাস কখন আসবে, অচেনা দেশে সঠিক বাসে গন্ত্যব্যে পৌছতে পারবো তো?

প্রত্যেক অপেক্ষার মধ্যে এক অনিশ্চয়তা থাকে – সেই অদ্ভুত অনিশ্চয়তা নিয়ে যখন বাঁচি, মনে হয় কখন সেই অনিশ্চয়তা, সেই অপেক্ষা শেষ হবে। কিন্তু যখন সেই অপেক্ষা স্মৃতি হয়ে যায় – সেই অপেক্ষাটাকেই যেন বড্ড ভালো লাগে।

সময়ের পথে অনেকটা এগিয়ে এসে পেছনের দিকে তাকালে অনিশ্চয়তা বলে তো আর কিছু থাকে না, সেই পুরনো সময়টাকে তো ততক্ষণে চিনে নিয়েছি।

আর বয়স যতই বাড়ে – সময়টাকে ততই চেনা হতে থাকে, এরই নাম বোধহয় অভিজ্ঞতা, স্মৃতি।

যাইহোক, যারা ভ্রমণ ভালোবাসে – তাদের ভ্রমণ যখন শেষ হয়, শুরু হয় মানস ভ্রমণ। ভ্রমণ স্মৃতিটা তখন আরও বেশী উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর সেটাই হয়ে যায় জীবন স্মৃতি।

পৃথিবীতে আসা ও থেকে যাওয়ার এক অপূর্ব পদচিহ্ন রয়ে যায়, জীবনের গল্প থেকে যায়। মানুষের কত কথা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, কতই না বিচিত্র জীবন যাপন – সবই যেন একই সঙ্গে মনে রয়ে যায়।   

মনে হয়, পৃথিবীতে তো কেউই চিরদিন থাকে না – কিন্তু পৃথিবী থেকে যাবে , জায়গা থেকে যাবে, আর সেই জায়গা গুলো হয়ত আমার উপস্থিতির অনুরণন টুকু নিয়ে থেকে যাবে – আর তাতেই আমি রয়ে যাবো – আমার জীবনের কিছু মুহূর্ত ঐ জায়গা গুলোর ক্ষণিকের ইতিহাসে রয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *