বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বেড়েছে পর্যটকদের সমাগম। শীতের তীব্রতায় পাহাড়ে পর্যটক বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, ট্যুরিস্ট পুলিশ পর্যটকদের নিরাপত্তায় শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হলে চলতি মওসুমে পাহাড়ে পর্যটকদের সমাগম আরো বাড়বে। এতে পার্বত্য অর্থনীতির অগ্রগতির সাথে সাথে কর্মসংস্থানেরও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এই শীতে সবচেয়ে বেশি পর্যটক যাচ্ছে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পর্যটন স্পটগুলোতে। সাজেক ভ্যালি এ ক্ষেত্রে সব থেকে এগিয়ে। ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে সাজেক ভ্যালির গুরুত্ব বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ উন্নত যাতায়াত সুবিধা। পর্যটকরা খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক যাচ্ছেন। এতে আলুটিলা, রিছাং ঝরনা, জেলা পরিষদ পার্কসহ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও পর্যটক বেড়েছে। পর্যটকদের সমাগম বাড়ায় অনেকটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে হোটেল-মোটেলগুলো।
পাহাড়ঘেরা অরণ্য, ঝিরি, ঝরনা ও উপত্যকার প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রতিবছরই শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যটকে মুখরিত হয়ে থাকে পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটন স্পট।
পর্যটকরা জানিয়েছেন, পাহাড়ের আবহাওয়া ভ্রমণ উপযোগী। তাই পরিবার কিংবা দলবেধে তারা পাহাড় ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।পাহাড়ের নির্মল বাতাস, মুক্ত হাওয়া ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। সব বয়সের পর্যটকদের কাছেই প্রধান আকর্ষণ এখন পাহাড়। পাহাড়ি এলাকার মনোরম দৃশ্য ও আঁকাবাঁকা পথ পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। তাছাড়া বাহারি খাবার-দাবারও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে পাহাড়ের প্রতি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আরও পর্যটক পাহাড় ভ্রমণে আসবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাগড়াছড়ি টুরিস্ট পুলিশ জানায়, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে। তারা পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ঘুরতে সহযোগিতা করছেন। জেলার জেলা পুলিশও পর্যটকদের সহায়তা করছে। এছাড়া সাজেকগামী পর্যটকদের ভ্রমণের সহায়তাও করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। অপর দিকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা জানান, পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পর্যটন মোটেল কাজ করছে।
সাজেক ভ্যালি
রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত দেশের বিখ্যাত পর্যটন স্পট সাজেক ভ্যারি। যা পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণে রয়েছে। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা অবস্থিত।
সাজেক হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন; যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। বর্তমানে সাজেকে ভ্রমণরত পর্যটকদের জন্য প্রায় সকল ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সারাবছরই সাজেক যাওয়া যায়। আর সাজেকে পাহাড়ধস বা রাস্তাধস এরকম কোনো ঝুকি নেই বলে দাবি প্রশাসনের।
সাজেক রুইলুইপাড়া এবং কংলাক পাড়া এই দুটি পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রুইলুই পাড়ার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭২০ ফুট । আর ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কংলাক পাহাড়-এ কংলাক পাড়া অবস্থিত। সাজেকে মূলত লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি। সাজেকের কলা ও কমলা বেশ বিখ্যাত। রাঙামাটির অনেকটা অংশই দেখে যায় সাজেক ভ্যালি থেকে। তাই সাজেক ভ্যালিকে বলা হয় রাঙামাটির ছাদ।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। আর দীঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই হয়ে এসে অনেক পথ হেঁটে সাজেক যাওয়া যায়। সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ি থেকে। খাগড়াছড়ি শহর অথবা দীঘিনালা হতে স্থানীয় গাড়িতে (জিপ গাড়ি, সি.এন.জি, মটরসাইকেল) করে সাজেকে যাওয়াই হচ্ছে বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যম। তবে সাজেক ভ্রমণে প্রশাসনের নিয়ম-কানুনগুলো জানা এবং সেই অনুযায়ী ভ্রমণ করা নিরাপদ বলে মনে করা হয়।
পর্যটকদের সর্বাধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই নিয়ম অনুসরণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়। সাজেকগামী জিপ গাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত। সাজেক যাওয়ার পথে বাঘাইহাটে হাজাছড়া ঝর্ণাঅবস্থিত। অনেক পর্যটকগণ মূল রাস্তা হতে সামান্য ট্রেকিং করে গিয়ে ঝর্ণাটির সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন ।
সাজেকে সর্বত্র মেঘ, পাহাড় আর সবুজের দারুণ মিতালী চোখে পড়ে। এখানে তিনটি হেলিপ্যাড রয়েছে। যা থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায়। সাজেকে একটা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হচ্ছে এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তিনটা রূপই দেখা মিলে। কখনো খুবই গরম, একটু পরেই হঠাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিকে ঢেকে যায় মেঘের চাদরে। মনে হয় যেন একটা মেঘের উপত্যকা। সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়-এ যাওয়া যায়। কংলাক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কংলাকে যাওয়ার পথে মিজোরাম সীমান্তের বড় বড় পাহাড় , পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, চারদিকে মেঘের আনাগোনা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উৎসবের সময় তাদের সংস্কৃতির নানা উপকরণ পর্যটকরা উপভোগ করতে পারেন।
তবে সাজেকগামী রাস্তায় গাড়ি চালানো অভিজ্ঞতা বিহীন চালকদের নিয়ে না যাওয়াই উত্তম। এক্ষেত্রে স্থানীয় জিপ গাড়ি ( চান্দের গাড়ি) ভাড়া করার পরামর্শ দেয়া হয়। সাজেকে পানি কিছুটা অপ্রতুল, তাছাড়া সাজেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তাই পর্যটকদের থাকার কটেজগুলোতে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। সাজেকের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা অত্যন্ত বন্ধুসুলভ, তাই পর্যটকদেরকেও তাদের সাথে সুলভ আচরণ করার ও তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পোষাক ইত্যাদি নিয়ে কোনো প্রকার বিরূপ মন্তব্য না করার অনুরোধ করা হয়।






