লজিং মাস্টার
ইমাম হোসেন সবুজ
প্রত্যুষে, শ্রাবণের উদর স্থলে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভূত হলো। সম্ভবত প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিচ্ছে তার দেহ। চোখ দুটোতে প্রচন্ড জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে। রাতে ভালো ঘুম হয়নি তার। হাত দিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে, কাপড়ের ব্যাগ হতে টুটুব্রাশ নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো। এখানে কোথায় যে ওয়াশরুম তা তার জানা নেই। হঠাৎ দেখল আমেনার ছোট ভাইটি উঠোনে হাঁটছে। হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো। তার কাছ থেকে এ ব্যাপারে সাহায্য নেওয়া যায়। শ্রাবণ অসম্ভব লাজুক প্রকৃতির। সে অতটা চঞ্চল প্রকৃতির নয়। শাওন কাছে আসলো।
–শাওন ভাইয়া, তোমাদের বাথরুমটা কোথায়?
সংসারের হাত ধরে নিয়ে গেল, বাথরুম দেখাতে। বাথরুমের পরিবেশ স্বচক্ষে দর্শন করে, শ্রাবণ যেন ভূত দেখার মতো আজকে উঠলো। বাথরুম ঠিক একটা আছে বটে, কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাথরুমটার দরজার অর্ধেকটা আছে উপরের অর্ধেকটা নাই। পিছনে তার জল নিমগ্ন ছোট একটি খাল। চারপাশে সবুজ বৃক্ষের একরাশ সমারোহ। প্রাকৃতিক পরিবেশ অথচ সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর। শ্রাবনের মন চায় না ওই বাথরুমের অন্তরে যেতে। কিন্তু উপায় নেই প্রচন্ড দৈহিক চাহিদার কাছে হার মানতে হলো। শ্রাবণ বদনি পূর্ণ করে, বাথরুমে বসে পরলো। হঠাৎ ঘটলো এক লজ্জাকর দৃশ্য। শ্রাবণ উপরের ফাঁকা দরজা দিয়ে দেখল এক অল্প বয়সী রমণী তার দিকে তাকিয়ে, আচলে মুখ লুকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। শ্রাবণের চোখে চোখ পড়ার সাথে সাথে তার মনে হল, ওই বাথরুমের মধ্যে জ্ঞান হারালে বুঝি এই লজ্জার হাত হতে বাঁচা যাবে। মহিলাও সম্ভবত একই কর্মের অভিপ্রায় হাজির হয়েছেন। বেহায়া রমণী ওই স্থান ত্যাগ না করেই পাথর মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরামকে হারাম বানিয়ে শ্রাবণ দ্রুত বেরিয়ে আসলো। এবং দ্রুত ওখান থেকে সরে পরলো। রুমে ফিরেই বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। লজ্জায় তার মাথা এখন ঝিমঝিম করছে ,রাগে শরীর দুলছে। মনে মনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, নাহ্ , আর এ বাড়িতে লজিং মাস্টার থাকা যায়না। আমেনার কাছে শুনলো, রাতে তার বিছানায় শয়ন করতে দিয়েছিল, রহমান হাজির কিছু জ
জুয়োখোর সঙ্গীদের। এই যদি হয় গৃহ শিক্ষকের মর্যাদা? অথচ শিক্ষক ছোট হোক বা বয়সে বড় হোক সে তো শিক্ষক, সমাজের সেই তো জাতির মেরুদন্ড। তাকে সম্মান না করলে গ্রাম শহর দেশ পাবেনা কোন সম্মান। শ্রাবন্তার ছোট্ট জীবন ক্ষনে, দারিদ্রতাকে বড্ড প্রনয়ে মনে প্রানে, ভালোবেসে এসেছে। কিন্তু এ ধরনের নোংরা পরিবেশের সাথে, সে আদৌ সম্পর্কিত নয়। মনের অজান্তে ক্রোধ তার উকি দেয়। মনের কৌতুহল তাকে বলে, মনিরের লম্বা চাপা সমৃদ্ধ গালে খুব কষ্টে একটি থাপ্পর তাকে উপহার দিতে। বেচারা এদের নিকটতম প্রতিবেশী, একবারও শ্রাবণকে অবগত করেনি এদের পরিবেশ। শুধু গুল মাখা বক্তৃতা দিয়ে শ্রাবণকে এখানে রেখে হাওয়া। একবারও খবর নিল না, তার সহপাঠী কেমন আছে। শাবানার অযথা সময় নষ্ট করবে না। নাস্তার টেবিলে নাস্তা গর্ছিত থাক। বাবা এবারকার মত এখান থেকে যাওয়া যাক। কাপড়-চোপড় বইপত্র দ্রুত হস্তে গুছাতে লাগলো। রহমান খুব চালাক, সহজে অনুধাবন করলেন নতুন শিক্ষকের মতিগতি।
–কি ব্যাপার শ্রাবণ স্যার। নাস্তা না খেয়েই এগুলো গুছাচ্ছেন ক্যান? আগে খাইয়া লন। শ্রাবণ চক্ষু লজ্জাতে সরাসরি বলতে পারল না তার ইচ্ছার কথা। শুধু সংক্ষেপে বললো, বাড়িতে খুব জরুরী কাজে যাচ্ছি পরে দেখা হবে। মনের খবর পেয়ে ছুটে এসে, শ্রাবণের হাত পায়ে ধরতে লাগলো। চালাকি করে জিনিসপত্র আটকাতে চাইলো। কিন্তু শ্রাবণের শুভ্র মুখের রক্তিম আভা দর্শন করেই, তার ছোটা ছুটি বন্ধ হয়ে গেল। উল্টো সে রহমান হাজিকে ধমকাতে ধমকাতে বলল, মিয়া নামের সাথে তো হাজী টাইটেল লাগাইছেন। মানুষ ভালো খাওয়া আর কাপড়চোপড় দেখেন না। এই যদি হয় হাজী বাড়ির পরিবেশ। পারলে বাড়ির পরিবেশটা একটু বদলান। আর কয় বছর পর তো জামাই আইবো আপনার বাড়িতে।
শ্রাবণ ভদ্রতা বজায় রেখে সালাম ও বিদায় প্রদান করে মাটির রাস্তায় নিজের পদতলকে সঞ্চালন করল। গ্রামের অজস্র সবুজবৃক্ষ তার পথ চলার ক্লান্তি দূর করে। গ্রামার গ্রামের মানুষ যেন জন্ম থেকেই খাঁটি। জনতা কলেজের গা ঘেঁষে যে গ্রামগুলো রয়েছে ,তা হরিপুর, পালবাড়ি, জগন্নাথপুর, আহমদ পুর, মোহাম্মদপুর। এর এক একটা গ্রাম যেন ,এক একটা স্বর্গের রাজ্য। শ্রাবণ হাঁটছে আর মাথার চারপাশে জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, কোথায় পাওয়া যাবে সেই শান্তির লজিং বাসস্থান। তাহলে মস্তিষ্ক শীতল রেখে পড়াশোনাটা অন্তত করা যেত। পালবারির সীমানা ছাড়িয়ে, হরিপুর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। হরিপুরের ঐতিহ্যবাহী মুনসি বাড়িটা, প্রিয় বন্ধু ফয়েজদের। ভাগ্যক্রমে ফয়েজ এর সাথে পথিমধ্যে দেখা হয়ে গেল। বন্ধুর মুখটি আমের আমসির মত দেখে ফয়েজ বলল, কিরে শ্রাবণ কোন প্রবলেম?
তোর মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন? প্লিজ আমাকে বল।
শ্রাবণ সংক্ষেপে তাকে সব বলল। দুই বন্ধুই কলেজে উপস্থিত হল। শ্রাবণ লক্ষ্য করল ইদানিং বেশ কয়েকটি ছাত্রী তাকে ফলো করছে। পাগল বিন্দুমাত্র মস্তিষ্কে জায়গা দেয় না এই সমস্ত অযাচিত বিষয়। কারণ তার পথটা সম্পূর্ণ কাটায় ভড়া। অনেকদূর তাকে যেতে হবে। ফয়েজ আর তুহিনের বন্ধুত্বে কোন গাফিলতি ছিল না কখনো। ভালোবাসা সম্পূর্ণ বিশ্বাস ভরা অনুভূতির ব্যাপার। থাকে না যায় ছোঁয়া না যায় দেখা। ফয়েজ তার কলেজের সিনিয়র বড় ভাই নুরুল হুদা কে বলল ভালো একটা লজিং এর ব্যাপারে। শুধু নুরুল হুদা নয়, সবাই মেধাবী শ্রাবণকে বড়ই ভালবাসে। নুরুল হুদা দ্রুত ব্যবস্থা নিল। জগন্নাথপুর উচ্চ বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষক হোসেন সাহেবের গৃহে। নুরুল হুদাও একই বাড়ির বাসিন্দা। হোসেন সাহেবের ও আনন্দের শেষ নেই নেদার মূল্যায়ন তো মেধাবীদের কাছেই হবে, এটাই স্বাভাবিক। শ্রাবণ আহমেদ বাস্তবতার বিলে, ভাসিয়ে দিয়েছে তার এ জীবন তরী। জীবন মানেই তো যুদ্ধের শিবির। কখনো অংশগ্রহণ, কখনো বিশ্রাম, কখনো প্রিয়ার প্রেম ভড়া উৎসাহ ,কখনো বিচ্ছেদ, বেদনার বিষাদ সিন্ধু। নতুন লজিংয়ে জয়েন করার আগেই শ্রাবণ চলে গেল কি তার সাথে দেখা করার জন্য। পিতার বাড়ি তার ভালো লাগে শুধু ভালো লাগেনা বড় ভাবির ঈর্ষার রোষানল। শ্রাবণ যেন তার আজন্মের শত্রু। প্রধান শিক্ষক হোসেন মিয়ার, সেই মিয়া বাড়ি। বাড়ির পরিবেশ সুনিপুণ পরিপাটি। স্বাস্থ্যকর থাকা খাওয়ার মাধ্যম। আভিজাত্যর , কঠোরতম পর্দার ব্যবস্থা। সেখানে নেই এতোটুকু রমণীকুলের অবাধ স্বচ্ছ বিচরণ। মুয়াজ্জিনের সুমধুর আহ্বানে, গৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন দলবদ্ধ বিভিন্ন বয়সের মুসল্লীবৃন্দ। দেখতে দেখতে এক মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। লজিং মাস্টারের চলনে-বলনে মিয়া বাড়ির সকলেই সন্তুষ্ট। কলেজের কয়েকটি মডেল টেস্ট পরীক্ষায় শ্রাবণের ফলাফল শীর্ষে। লজিং হোম এর ছাত্র দুটো হয়েছে শ্রাবণ এর মন মত। একদিন পিতা শাহেদ আসলো, ছেলের দেখা পেতে। শ্রাবণের দিকে পিতা তার বড়ই স্নেহ দৃষ্টিতে তাকালো, তার পিঠে হাত দিয়ে দরদী পিতা বলল, শ্রাবণ তোমার স্বাস্থ্য অনেক সুন্দর হয়েছে। দরদী পিতা অনুধাবন করলেন, ছেলে আমার এখানে বোধ হয় কুশলে আছে। আর মাত্র ২০ দিন হাতে আছে। সামনেই প্রথম বর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা। পড়াশোনায় নিজের দায়িত্বে চাপ এনে নিল শ্রাবণ। কলেজে অধ্যায়নরত ডলি ,মিতালী, রাবিয়া, আসমা এরাও প্রচন্ড মেধাবী। শ্রাবণের সাথে চলছে তাদের তুমুল মেধা-প্রমাণের নীরব লড়াই। মেয়েদের মধ্যে ডলি অসম্ভব মেধাবী। একদিন কাকলি নামের তার এক বান্ধবী তাকে খোঁচা দিয়ে বলল, দেখিস, শ্রাবণ অবশ্যই তোকে বার্ষিক পরীক্ষায় সিরিয়ালের পিছনে ফেলবে। ঠাকুরের কথা শোনা মাত্রই ডলি যেন ঈর্ষার আগুনে ভস্ম হতে লাগলো। প্রচন্ড রাগ মাখা বিষে, বিষহরির মতো ফনা তুলে বলল, আমিও দেখে নেব, শ্রাবণ কি করে ভালো রেজাল্ট করে? আমি ভালো করে জানি, হিরোকে কিভাবে জিরো করতে হয়।
–পারবিনা ডলি। এ তোর মিছে দম্ভ।
–নারী হয়ে একথা তোর মুখে মানায় না। জগৎ মাঝে অসংখ্য নজির বিদ্যমান। এই নারীর ছলনায়, শত শত বছরের সাধনা জলে ফেলে, সাধকরা ভাঙ্গা তরী নিয়ে ডুবে মরেছে। আর হাঃ হাঃ আর শ্রাবণ? সে তো প্যাকেট করা গুড বয়। আমি ডলি চ্যালেঞ্জ করছি দেখতে পাবি।
কাকুলি ছিল, নারীর সুলভ পেট পাতলা। শ্রাবনকে খবরটা দিতে মোটেও দায়িত্বহীনতার অবকাশ করলোনা। শ্রাবন হেসে এসে শান্তভাবে বলল, কাকুলি এটা তো ভালো খবর। চ্যালেঞ্জ না করলে মেধার বিকাশ হয়না। আই এক্সেপ্ট হার চ্যালেঞ্জ। শ্রাবণের তিনদিন ধরে প্রচন্ড জ্বর। কলেজে যেতে পারেনি। ভয়েস তুহিনের মনটাও তেমন ভালো নেই। ওরা তিনজন যেন একটি বৃক্ষের তিনটি শাখা।





















