পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের নৈতিকতা: বিশ্বশান্তি নাকি স্বার্থের ছদ্মবেশ?

ফারজানা আক্তার : একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে ‘নৈতিকতা’ শব্দটি প্রায়ই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সুরের মতো। একদিকে রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং বিশ্বশান্তির বুলি আউড়ায়, অন্যদিকে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তারা এমন সব সিদ্ধান্ত নেয় যা সরাসরি নৈতিকতার পরিপন্থী। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি যেন শক্তিশালীরা যা করতে পারে তাই করে আর দুর্বলরা যা সহ্য করতে হয় তাই সহ্য করে এমন নীতিবাক্যকে ইঙ্গিত করে।

আজকের বিশ্বের মানবতার বাস্তবতা তারই তীব্র প্রতিফলন। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নৈতিকতা কি আসলেই কোনো আদর্শিক ভিত্তি নাকি স্রেফ একটি কৌশলগত ভন্ডামির বহিঃপ্রকাশ মাত্র,এই বৈপরীত্য থেকেই যায়। বাস্তববাদী রাজনীতির চশমায় দেখলে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো নিজের অস্তিত্ব রক্ষা এবং প্রভাব বিস্তার। এখানে নৈতিকতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়। যখন কোনো শক্তিধর দেশ অন্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তখন তারা প্রায়ই গণতন্ত্র উদ্ধার বা মানবিক বিপর্যয় রোধের দোহাই দেয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় সেই হস্তক্ষেপের পেছনে অধিকাংশ সময় লুকিয়ে থাকে খনিজ সম্পদ দখল, কৌশলগত আধিপত্য কিংবা মিত্রদের রক্ষা করার মতো আক্রমণাত্বক উদ্দেশ্য। একই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এক দেশের ক্ষেত্রে তারা সোচ্চার হয়, আবার অন্য দেশের ক্ষেত্রে যেখানে তাদের স্বার্থ আছে তারা নীরব থাকে। এই দ্বিমুখী নীতিই সাধারণ মানুষের চোখে তাদের নৈতিকতাকে ভন্ডামি হিসেবে চিত্রিত করে।তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর একটি গঠনমূলক ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আন্তর্জাতিক আইন, বাণিজ্য চুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তাদের নেতৃত্ব দিতে হয়। অনেকে যুক্তি দেন, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি পুরোপুরি নীতিহীন হতো তবে পৃথিবী আরও অনেক বেশি বিশৃঙ্খল ও সহিংস হতো। অর্থাৎ, তাদের নৈতিকতা সবসময় মেকি নয় বরং এটি অনেক সময় বাস্তববাদী নৈতিকতা যেখানে বড় কোনো বিপর্যয় এড়াতে ছোট কোনো অনৈতিক পথ বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখনই যখন নৈতিকতাকে স্রেফ একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আধিপত্যবাদকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়। বর্তমানের বহুমুখী বিশ্বে নৈতিকতা আর শক্তির এই সংঘাত আরও প্রকট। যখন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র নিজের আইন অন্যকে মানতে বাধ্য করে কিন্তু নিজে তা লঙ্ঘন করে তখন তা নিঃসন্দেহে নৈতিকতার আবেদন হারায়। বরং এই আবেদন মানুষের কাছে ছেলে ভোলানো গল্পের মতো বার্তা দেয়।

শক্তিধর রাষ্ট্রের নৈতিকতা পুরোপুরি বাস্তবতাও নয় আবার পুরোপুরি ভন্ডামিও নয়। এটি মূলত ক্ষমতার দাপট আর আদর্শিক প্রচারণার একটি জটিল মিশ্রণ। যখনই একটি দেশ শক্তিশালী দেশের শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত ত্রুটি ও আঙুল দিয়ে ভুল শুধরাতে যায় তখনই সেই স্বেরাচারী শাসনের যাতাকলে সেই দেশকে ফেলার প্রাণপণে চেষ্টা করা হয়।ইরান-ঈসরায়েলের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থান্বেষী মধ্যস্থতা যেন তারই ইঙ্গিত দেয়।

যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে ন্যায্যতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থ বড় থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বড় শক্তিগুলোর নৈতিকতা তর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না। আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের রেজোলিউশনগুলো যেন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রয়োগের জন্য তৈরি। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যখন নিজ স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, তখন তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বিশ্বে এখনো গড়ে ওঠেনি। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নৈতিকতা অনেকটা রূপকথার মতোই শুনতে ভালো লাগে কিন্তু বাস্তবে এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযুক্ত না হলে বড় রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক অবস্থান কেবল এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেই বিবেচিত হবে।

প্রকৃত নৈতিকতা কোনো সুবিধাবাদী কৌশল হতে পারে না, এটি হতে হয় সর্বজনীন। নয়তো শক্তির দাপট আর ভন্ডামির মধ্যবর্তী ধূসর এলাকাটি আরও অন্ধকার হয়ে উঠবে।পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা কোনো ধ্রুব সত্য নয় বরং এটি প্রায়শই একটি কৌশলগত হাতিয়ার। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের সুবিধামতো নৈতিকতার সংজ্ঞা পরিবর্তন করে, তখন তা বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসের সংকট তৈরি করে।

এই দ্বিচারিতা কেবল একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক নয় এর ফলে ভেঙে পড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং বিপন্ন হয় বিশ্বশান্তি। ক্ষমতার দাপটে সত্যকে হয়তো সাময়িকভাবে আড়াল করা যায় কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ বিচার থেকে কোনো সাম্রাজ্যই শেষ পর্যন্ত রেহাই পায় না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শক্তির অপব্যবহার সারাবিশ্বের বিবেককে আজও হানা দেয় । ঠিক সেই পদচিহ্ন অনুসরণ করে পুনরায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখায় বিশ্ববাসীকে যেন সম্মুখীন হতে না হয় তা সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে আন্তর্জাতিক শান্তি শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ করে জাতিসংঘ যার প্রধান অঙ্গ নিরাপত্তা পরিষদ ও শান্তিরক্ষা মিশন।

এছাড়াও, আন্তর্জাতিক আদালত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি, সার্ক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে কূটনৈতিক ও আইনগতভাবে শান্তি রক্ষায় কাজে তৎপর হতে হবে।যদি বিশ্বকে সত্যিই একটি সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ বাসযোগ্য স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তবে নৈতিকতাকে জাতীয় স্বার্থের দাস হওয়া থেকে মুক্ত করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত ন্যায়বিচার কেবল দুর্বলের জন্য এবং দায়মুক্তি কেবল সবলের জন্য বরাদ্দ থাকবে ততদিন শক্তিধর রাষ্ট্রের নৈতিকতা শব্দটি ইতিহাসের পাতায় এক বিশাল ভন্ডামি হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে আসে। স্বার্থের এই সংঘাতের মাঝেই একদিন এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে যেখানে শক্তি হবে ন্যায়বিচারের দাস, শোষণের হাতিয়ার নয়।

লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *