বিশ্ব অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়


২০২৫ সালে বছরজুড়েই বাণিজ্যযুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি। বছর শেষে এসে এটি স্পষ্ট যে, এই সংকটগুলোর বড় অংশই ২০২৬ সালেও বিশ্ব অর্থনীতিকে তাড়া করে বেড়াবে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)–এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। সংস্থাটির মতে, বিশ্ব অর্থনীতি ‘স্থিতিস্থাপক’ হলেও এখনো ভঙ্গুর।


শুল্ক ও বাণিজ্যযুদ্ধ

২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন শুল্কনীতি ঘোষণা করে বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দেন। এর ফলে বাজারে অস্থিরতা, ব্যবসায় অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহব্যবস্থায় পুনর্গঠন শুরু হয়।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে অনেক দেশের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে, তবু গড় মার্কিন শুল্কহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশে, যা ১৯৩৪ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৬ সালে এই শুল্ক আরোপের বৈধতা নিয়ে রায় দিতে পারেন। তবে আদালত শুল্ক বাতিল করলেও প্রশাসন বিকল্প আইনি পথে তা পুনর্বহাল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে শুল্ক-অনিশ্চয়তা আগামী বছরও বড় ঝুঁকি হিসেবেই থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন উত্তেজনা

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য উত্তেজনা পুরোপুরি কাটার লক্ষণ নেই। গত অক্টোবরে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে ১২ মাসের জন্য ‘সমঝোতা’ হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও রোবটিকসে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ২০২৬ সালেও চলবে। এসব খাতে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।


চীনের কাঠামোগত দুর্বলতা

চীনের অর্থনীতি ২০২৬ সালে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দেশটির সামনে রয়েছে বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা, অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা এবং ভোক্তা চাহিদার দুর্বলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা।

বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদননির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলের কারণে চীনে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু ভোক্তা ব্যয় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। সরকার অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ানো ও আবাসন খাত স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এই ভারসাম্যহীনতা ২০২৬ সালেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।


মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ

বিশ্বের অনেক অঞ্চলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোজোনে, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। শুল্ক ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি সুদ কম রেখে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখবে সে বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে রয়েছে। সুদহার বাড়লে ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ফ্রান্সসহ ইউরোজোনের একাধিক দেশ এরই মধ্যে উচ্চ ঋণ ও বাজেট ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে।


এআই’র উত্থান নিয়েও শঙ্কা

২০২৬ সালেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ জোরালো থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোয় শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যা দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অতিমূল্যায়ন একটি ‘বুদ্‌বুদ’-এ (বাবল) রূপ নিতে পারে। যদি এই বুদ্‌বুদ ফেটে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার মুখে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সাল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হবে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য উত্তেজনা, উচ্চ ঋণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অনিশ্চয়তার বছর। কিছুটা স্থিতিস্থাপকতা থাকলেও ঝুঁকি রয়েছে অনেক এবং সেগুলো মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্তই অপেক্ষা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *