মু.জুবায়ের আহম্মদ তামিম : মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যুদ্ধ, প্রতিশোধ, অবিশ্বাস এবং কূটনীতির এক জটিল অধ্যায় বারবার ফিরে আসে। কখনো যুদ্ধের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, আবার কখনো সেই আগুনের ভেতর থেকেই শান্তির ক্ষীণ আলো দেখা যায়। সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা ঠিক তেমনই একটি অধ্যায়, যেখানে বিশ্ব একদিকে যুদ্ধের আশঙ্কায় শিউরে উঠেছে, অন্যদিকে আবার হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও দেখতে শুরু করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে হরমুজ প্রণালী কেবল একটি সামুদ্রিক জলপথ নয়; এটি হলো পৃথিবীর অর্থনীতির ধমনী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়েই প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
(হরমুজ প্রণালী ইরান)
সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ এটি। অর্থাৎ হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে কেবল কয়েকটি জাহাজ আটকে যাওয়া নয়, বরং এর অর্থ হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় ঠিক সেটিই ঘটেছিল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। তেহরানের বক্তব্য ছিল, যখন তাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে, যখন তাদের ভূখণ্ডে হামলার আশঙ্কা রয়েছে, তখন বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে তারা নিজেদের নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন করে ঝুঁকির হিসাব কষতে শুরু করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষত এশিয়ার তেল আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রগুলো, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ এই অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। ফলে হরমুজে অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারত।
এমন পরিস্থিতিতে অবশেষে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে মনে হতে পারে, এটি হয়তো তেহরানের কূটনৈতিক দুর্বলতা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তার উল্টো। ইরান খুব সচেতনভাবেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বুঝেছে, বিশ্ব অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন জিম্মি করে রাখলে আন্তর্জাতিক সমর্থন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে তারা এটিও উপলব্ধি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইরানের অর্থনীতি, রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্যও ভয়াবহ হতে পারে। তাই তারা যুদ্ধের ভাষা পুরোপুরি ত্যাগ না করেও, আলোচনার দরজা খোলা রাখার একটি কৌশল নিয়েছে।
তবে হরমুজ খুলে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ইরান বিনা শর্তে পিছু হটেছে। বরং তেহরান খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতি একসঙ্গে চলতে পারে না। ইরান এও জানিয়ে দিয়েছে যে, দশ দফা শর্ত থেকে তারা পিছু হটবে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখে, নিষেধাজ্ঞা জারি রাখে, আবার অন্যদিকে হরমুজ খুলে দেওয়ার দাবি জানায়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানের বক্তব্য হলো, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
এই অবস্থান আসলে ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলেরই অংশ। ইরান বরাবরই চেয়েছে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদেরকে একটি সমমর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হোক। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এসেছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা সবকিছু মিলিয়ে তেহরান মনে করে, তাদের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে এবার তারা হরমুজকে একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। ওয়াশিংটন উপলব্ধি করেছে, হরমুজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক বাজারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে তার ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও লাগবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও আপাতত সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পথ থেকে কিছুটা সরে এসে শর্তসাপেক্ষে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলছে, যা ইরানে আমেরিকার স্থলে অভিযানের দিকে ইঙ্গিত করে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উভয় পক্ষই এখন বুঝতে শুরু করেছে যে, যুদ্ধের মূল্য শান্তির চেয়ে অনেক বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে সেটি কেবল ইরান ও আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো, সিরিয়া, লেবানন, এমনকি বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও। তখন গোটা অঞ্চল আরও ভয়াবহ অস্থিরতার দিকে চলে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নতুন করে আলোচনার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রথম পিচ্ টক পন্ড হলেও, ইসলামাবাদ আবারো ইতোমধ্যে দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও তাদের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান সামনে এসেছে।
তবে শুধু পাকিস্তান নয়, কাতার, ওমান কিংবা তুরস্কের মতো দেশগুলোকেও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বহু সংকটের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সরাসরি আলোচনার চেয়ে পরোক্ষ মধ্যস্থতা বেশি কার্যকর হয়। কারণ দুই পক্ষ প্রকাশ্যে আপস করতে না চাইলেও, পর্দার আড়ালে অনেক সময় একটি সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়।
তবে যুদ্ধবিরতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। ইরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে অবস্থান বদলেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, ইরান আলোচনার আড়ালে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সময় নেয়। ফলে দুই পক্ষই একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। এই অবিশ্বাস দূর না হলে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, হরমুজ খুলে দেওয়ার পরও কি পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে? উত্তর হলো, না। কারণ এখনো জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজের বীমা খরচ বাড়িয়েছে। কিছু কোম্পানি বিকল্প রুট খুঁজছে। আবার অনেক দেশ তাদের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির জন্য যে পথটি সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, সেটি হলো ধাপে ধাপে আস্থা তৈরি করা। প্রথম ধাপে হরমুজে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে উভয় পক্ষকে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনায় বসতে হবে। তৃতীয় ধাপে নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে একটি বৃহত্তর সমঝোতার চেষ্টা করতে হবে। কারণ শুধু অস্ত্রবিরতি দিয়ে স্থায়ী শান্তি আসে না; শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক সম্মান।
আজকের বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালী খোলা মানে কেবল কয়েকটি জাহাজের চলাচল শুরু হওয়া নয়। এটি আসলে যুদ্ধের ক্লান্ত দুই পক্ষের এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এই প্রশ্ন: ইরান ও আমেরিকা কি আবারও যুদ্ধের দিকে ফিরে যাবে, নাকি ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করে শান্তির দিকেই এগোবে?
লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নোবিপ্রবি।





















