সাবিহা তারান্নুম মিম : বৈশ্বিক সংঘাতে অনিশ্চয়তার হাওয়া বইছে বিশ্বের আবহাওয়ায়। রাষ্ট্রশক্তি প্রদর্শনে এক দেশ অন্য দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে উন্মত্ত হয়ে ছুঁড়ছে মিসাইল। মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতায় বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সমঝোতাকে উপেক্ষা করে ধ্বংসাত্মক পথে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্বের অভ্যন্তরীণ প্রাণ শক্তিকে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এই সংঘাত একটি বড় ধাক্কা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ সংঘাতের বিরূপ প্রভাবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সংকটাপন্ন। একুশ মাইলের দীর্ঘ হরমুজ প্রণালীর মধ্যে ২ মাইলের সরু পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক পঞ্চমাংশ এই পথ ব্যবহার করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে সংঘাতের প্রভাবে ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। পৃথিবীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। প্রতিবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার সতর্কবার্তা থেকে বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়ায় ভয়ংকর যে সংকট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার প্রভাবে তেল পরিবহন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বাংলাদেশের ফিলিং স্টেশনের বাইরে দীর্ঘ লাইন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। মার্কিন নীতি নির্ধারকদের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্বস্তি প্রদানের জন্যে সরবরাহের উপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে যে সকল পদক্ষেপ নিচ্ছে তা মূলত ভূ-রাজনৈতিকভাবে তৈরি করছে একটি জটিল সমীকরণ।
বর্তমানে যখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা মূলত শক্তি সম্পন্ন বড় বড় দেশগুলোর আঞ্চলিক সংঘাতের ফলে একটি বড় যুদ্ধের উপক্রম হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই পরিস্থিতিই বিশ্বযুদ্ধে নিয়ামক। বিশ্ব রাজনীতিবিদদের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক বাণী থেকে প্রতীয়মান হয়, পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বহু দেশের এই সংঘাত মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূলত ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইরান ও ইসরায়েলের সাথে কিছু কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ‘Iranian Revolution’ এরপর ইরানের তৎকালীন নব্য নির্বাচিত সরকার ইসরায়েলকে একটি শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
যার দীর্ঘমেয়াদী রূপ বর্তমানের এই বৈশ্বিক সংঘাত। সাম্প্রতিক সময় মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশের গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলাফল বিভিন্ন হামলা ও প্রক্সি যুদ্ধ। দুই দেশের সামরিক হামলার ঘটনা সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিই মূলত বড় সংঘাতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এই সংঘাত। কেননা ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা, কূটনৈতিক সমর্থন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের শুরুটা ছিল আক্রমণাত্মক। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ থেকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বর্তমান উত্তেজনা, পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর সংঘাত মানব সভ্যতার জন্য ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ হবে; যা ইতিমধ্যে বর্তমানে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে। অপরদিকে রাশিয়া ও চীন অনেক ক্ষেত্রেই ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে এই সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিশক্তির এই চলমান যুদ্ধের সংঘাতে বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বিশ্ব শান্তির পরিস্থিতি বেসামাল।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এমন একটি স্থানে দাঁড়িয়েছে যেখানে ইরান স্পষ্টই পরাজিত নয়; অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধের বিরূপ প্রভাবে বিশ্ববাজারে বাণিজ্য ও জ্বালানিতে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজমান। বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য এমন অনিশ্চয়তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এই যুদ্ধের প্রভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো ব্যবস্থায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যে সকল স্থানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সে সকল জায়গায় ইরানের হামলার আশঙ্কার ফলে বিভিন্ন দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ।
অনেক কৌশলবিদদের মতামত, “এ যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করা। যার প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুযোগ গ্রহণ করতে পারবে।” যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আধিপত্য বজায় রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষমতা অর্জন করবে। তবুও যুদ্ধ যদি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করে,তবে সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ব্যয়বহুল হওয়ার ফলে ক্লান্তিকর হয়ে উঠবে। ২০২৪ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় আমেরিকায় ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমানে পুরোপুরি তার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৌশলগত সমঝোতা না হলে এর প্রভাবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। নচেৎ ইরানকে সম্পূর্ণ পরাজিত করা অত্যন্ত দুরূহ।
অস্থিরতা বিরাজ করা এই পরিস্থিতিতে ভুল কোন পদক্ষেপ, পুরো বিশ্বকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক একটি জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক মানুষ মনে করেন আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতে পারে। যা বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি স্বরূপ ও মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
পৃথিবীর একদিকে চলছে সভ্যতার সৃষ্টি, আরেকদিকে ধ্বংস। আধুনিককালে বিশ্বসভ্যতা যখন প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, সফলতার জয়গান মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্য করে তুলছে। ঠিক তখনই মুদ্রার অপর পিঠে মানুষের বুদ্ধিমত্তার চূড়ান্ত অপব্যবহারের ফল যুদ্ধে ব্যবহৃত এসকল অত্যাধুনিক অস্ত্র। একটি দেশ অপর একটি দেশকে ছুঁড়ে দিচ্ছে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বে দীর্ঘদিন উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা চলমান থাকবে। বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই উত্তেজনা না কমলে তা আমাদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথেই এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বর্তমান উত্তেজনার সময়ে বিশ্ব নেতাদের সমঝোতাই শান্তির পথে এগিয়ে নিয়ে আসতে পারে। তবেই মানবসভ্যতা সংঘাতের অন্ধকার কাটিয়ে স্থিতিশীল ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
লেখিকা : ইডেন মহিলা কলেজ, সমাজকর্ম বিভাগ।





















