নববর্ষ কেবল পোশাকে নয়, চিন্তায় আসুক বাঙালিয়ানা

মিথিলা জসিম তন্নি : নববর্ষ এলেই বাংলার আকাশে এক অন্যরকম আবহ ভেসে ওঠে। কাঁচা রোদের আলোয়, কাঁঠালচাপার গন্ধে, মঙ্গল শোভাযাত্রার ঢাকে মনে হয় এ যেন শুধু একটি দিন নয়, একটি চিরন্তন অনুভূতির পূণর্জাগরণ। চারিদিকে উৎসবের রঙ,মানুষের মুখে হাসি, প্রাণে এক অনাবিল উচ্ছ্বাস। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি,পাঞ্জাবির উজ্জ্বলতা, পান্তা ইলিশের আয়োজন সবমিলিয়ে যেন একদিনের জন্য হঠাৎ করেই আমরা বাঙালি হয়ে উঠি। নববর্ষ উৎসবের অন্তরালে যে বাঙালিয়ানা তা কি সত্যিই আমাদের চিন্তায় প্রবেশ করে? নাকি বাহ্যিক সাজেই সীমাবদ্ধ থাকে? নববর্ষ আসে প্রতিবছর কিন্তু প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যিই নতুন হই, নাকি শুধু পুরোনো অভ্যাসের ওপর নতুন রঙের প্রলেপ দেই? লাল-সাদার বাহারি সাজ, পান্তা ইলিশের ঐতিহ্য, মেলার কোলাহল, সবই আমাদের উৎসবের বাহ্যিক প্রকাশ।বাঙালিয়ানা কি এতটুকুতেই শেষ?না,এর গভীরে আছে এক বিস্তৃত মানসিকতা, যা হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠার অপেক্ষায় থাকে।

বাঙালিয়ানা মানে কেবল ঐতিহ্যের অনুসরণ নয় এটি এক চেতনা -যেখানে রয়েছে ভাষার প্রতি ভালোবাসা, আছে সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বাঙালিয়ানা আমাদের ইতিহাসের, আত্নার, অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ আমরা বাঙালিয়ানাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলি একদিনের আনুষ্ঠানিকতায়। অথচ এই চেতনা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বয়ে চলার কথা।

যে বাঙালি রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে মানবতার কথা বলে, নজরুলের কবিতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, সেই বাঙালি কি কেবল একদিনের জন্যই জাগ্রত থাকবে? নববর্ষ আমাদের সামনে সেই সুযোগ এনে দেয় নিজেকে নতুন করে দেখার, নিজের শিকড়কে খুঁজে পাওয়ার, নিজের ভেতরের সত্ত্বাটিকে জাগিয়ে তোলার। আমরা কি হারিয়েছি কি ধরে রেখেছি সেই হিসেব করার একটি উপলক্ষ হলো নববর্ষ। আমরা যদি সত্যিই এই উৎসবকে অর্থবহ করতে চাই তবে আমাদের চিন্তায় আনতে হবে বাঙালিয়ানার সেই গভীরতা। বর্তমানে আমাদের সমাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে, যেমন প্রযুক্তির অগ্রগতি, জীবনযাত্রার দ্রুতগতি, এই পরিবর্তনের ভিড়ে আমরা অনেক সময় আমাদের নিজ সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলি।

নববর্ষ আমাদের জন্য এক নতুন সূচনা, কিন্তু সেই সূচনা বাহিরে না,ভেতরে। আমরা যদি এই দিনে নিজেদের ভুলগুলোকে স্বীকার করতে পারি, নিজেদের সংকীর্ণতা থেকে বের হয়ে আসতে পারি তবে সেটিই হবে প্রকৃত নবায়ণ। বাঙালিয়ানা তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে যখন আমরা অন্যের কষ্টকে নিজের মতো করে অনুভব করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব না থেকে প্রতিবাদ করতে শিখি।

আমরা বাঙালিয়ানাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলি কিছু বাহ্যিক চিহ্নে পোশাক,খাবার,উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায়। অথচ এগুলো শুধু প্রকাশের মাধ্যম, মূল নয়। মূল হলো সেই চিন্তা যেখানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকে না,যেখানে সহমর্মিতা, সৌন্দর্য এবং মানবিকতা আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

আমরা প্রতিবছরই নববর্ষ উদযাপন করি নতুন পোশাকে, ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদে,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বর্ণিলতায়। কিন্তু যদি এইসব আয়োজনের মাঝেও আমাদের চিন্তা অপরিবর্তিত থাকে তবে কি সত্যিই আমরা নতুন হতে পারি? বাঙালিয়ানা তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা আমাদের অন্তরে জায়গা করে নেয়, আমাদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও আচরণে তা প্রতিফলিত হয়।বিশ্বায়নের যুগে আমরা নানা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এর মাঝে নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের উচিত আমাদের শিকড়কে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার।যাতে আমরা বিশ্নমঞ্চে নিজেদের পরিচয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারি।

বাঙালিয়ানা তখনই পূর্ণতা পাবে যখন আমরা শুধু পোশাকে নয় আমাদের মনন ও মূল্যবোধে প্রতিফলিত হবে। বাঙালিয়ানা কখনো আধুনিকতার বিরোধী নয়,এটি আমাদের শেখায় কিভাবে আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন তৈরি করতে হয়। যে গাছ তার শিকড় ভুলে যায় সে গাছ বেশিদিন টিকতে পারে না।তেমনি বাঙালিয়ানা ভুলে গেলে একদিন আমাদের অস্তিত্বই মুছে যাবে। তাই আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও উচিত নিজেদের সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করা। এই নববর্ষে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক- আমরা শুধু নতুন পোশাকে নয়,চিন্তায়ও বাঙালি হই; শুধু একদিনের জন্য নয়,প্রতিটি দিনেই বাঁচিয়ে রাখি আমাদের বাঙালিয়ানা। কারণ, বাহ্যিক সাজ ক্ষণস্থায়ী,চিন্তার সৌন্দর্যই চিরন্তন।

লেখিকা : শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *