নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ

ফারদিন মোহাম্মদ : নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা, অনিশ্চয়তা ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জাতি আবারও মুখোমুখি হয়েছে এক নতুন বাস্তবতার। ক্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার নতুন অধ্যায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি একটি জাতির নতুন করে স্বপ্ন দেখার ও নিজেকে আমূল পরিবর্তনের সুযোগ। বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লব এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টার পর জনগণের রায়ে যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তবে এই প্রত্যাশার সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা কেমন রাষ্ট্র দেখতে চাই, তা নিয়ে আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনে আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতির ধারণা সূচকে ১০০ এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ২৪, যা বিশ্বজুড়ে দেশটিকে নিচের দিক থেকে ১৩তম অবস্থানে রেখেছে। এই ভয়াবহ চিত্র বদলাতে হলে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৩১.৬৭ শতাংশ মানুষ সরকারি সেবা নিতে গিয়ে এখনো ঘুষ বা অনিয়মের শিকার হন। এই সংকট উত্তরণে ডিজিটাল গভর্নেন্স বা প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-মিউটেশন বা অনলাইন ভূমি সেবার মতো উদ্যোগগুলো এই খাতে দুর্নীতির সুযোগ ও দালালের দৌরাত্ম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সরকারি আবেদন, পেমেন্ট এবং ফাইল ট্র্যাকিং সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক করা হলে কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমবে, ফলে ঘুষের লেনদেনও হ্রাস পাবে। এছাড়া, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন করা এখন সময়ের দাবি। মূলত স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা। সাধারণ মানুষের জীবন আজ দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস। ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা নতুন সরকারের জন্য হবে “এসিড টেস্ট”। জনগণ চায় বাজার সিন্ডিকেটগুলোর কঠোর দমন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফিরিয়ে আনা না গেলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে আপসহীন ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং করের আওতা বৃদ্ধি করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো না গেলে উন্নয়ন কার্যক্রম টেকসই হবে না। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পুনরায় গতি পাবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য। বর্তমানে জিডিপির মাত্র ১.৭৬% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ৪-৬% হওয়া উচিত। মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা বাদ দিয়ে মানসম্মত ও সৃজনশীল শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণা বলছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ স্নাতক বের হলেও দক্ষতার অভাবে বড় একটি অংশ বেকার থাকছে। এই ‘স্কিল গ্যাপ’ দূর করতে কোডিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা জরুরি। এছাড়া, উচ্চশিক্ষায় গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের করে তুলতে হবে। মূলত, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সঠিক বিনিয়োগ ও আধুনিক শিক্ষানীতিই পারে আগামীর বাংলাদেশকে বদলে দিতে।

নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের প্রধান প্রত্যাশা হলো একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান কাঠামো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত উচ্চস্তরের বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে ১৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নিরসনে গতানুগতিক বিসিএস-কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে বেসরকারি খাত ও শিল্পায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। নতুন সরকারকে এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) বাড়বে যদিও ২০২৪ সালে নিট এফডিআই ১৩.২% হ্রাস পেয়ে ১.২৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রসারে নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট ও সুলভ মূল্যে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইটি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৪.৫% (৭২৪.৬ মিলিয়ন ডলার) অর্জিত হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে ‘স্কিল গ্যাপ’ দূর করে তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ ও ইনকিউবেশন সুবিধা প্রদান করা জরুরি, কারণ ২০২৪ সালে স্টার্টআপ অর্থায়ন ৪১% কমে ৪১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের প্রসারের মাধ্যমে যদি তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তবেই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। মূলত উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা, শিল্পবান্ধব নীতি এবং আধুনিক উদ্যোক্তা সহায়ক পরিবেশের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে আগামীর সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ।

নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাত উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। হাসপাতালগুলোতে সেবা সহজ ও দ্রুত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা প্রয়োজন, যাতে রোগীরা ভোগান্তি ছাড়াই চিকিৎসা পেতে পারে। পাশাপাশি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা জরুরি।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্লিনিক, মোবাইল চিকিৎসা সেবা এবং টেলিমেডিসিন চালু করলে গ্রামের মানুষ সহজেই স্বাস্থ্যসেবা পাবে। সব মিলিয়ে, একটি কার্যকর ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের মূল ভিত্তি।

নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি ও বৈশ্বিক মর্যাদার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে না ঝুঁকে প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে সুসম্পর্ক রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে গত বছর বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা ফিরিয়ে আনতে দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ ও বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি নিশ্চিত করা নতুন সরকারের প্রধান কাজ। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে ইউরোপ ও জাপানের মতো নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। একইসাথে, বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি করা প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তায় দূতাবাসগুলোকে আরও আন্তরিক ও সক্রিয় হতে হবে। মূলত, চতুর কূটনীতি আর প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারলেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

জনগণের প্রত্যাশা যেমন বিশাল, তেমনি চ্যালেঞ্জও বহুমাত্রিক। এই চ্যালেঞ্জকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একইসাথে দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা কেবল তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান নয়, বরং একটি টেকসই ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করবে। সবশেষে বলা যায়, জনগণের অংশগ্রহণ, সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারবে এটাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *